Homeসর্বশেষদখলদারদের দাপটে মৃত্যুর প্রহর গুনছে চকরিয়া-সুন্দরবন

দখলদারদের দাপটে মৃত্যুর প্রহর গুনছে চকরিয়া-সুন্দরবন

Published on

spot_img

জোয়ারের পানি যেখানে একদিন শ্বাসমূলের ফাঁক গলে বনের ভেতর ঢুকে প্রাণ সঞ্চার করত, সেখানে আজ দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি চিংড়ি ঘের- নিস্তব্ধ, নোনা, প্রাণহীন। কক্সবাজারের চকরিয়া আর নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই বনভূমিকে একসময় ডাকা হতো ‘চকরিয়া-সুন্দরবন’ নামেই যার পরিচয়, বাগেরহাট-খুলনার সুন্দরবনের সহোদর। কিন্তু আজ সেই নামের সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব বিস্তর। বনটি এখন কেবল মানচিত্রে টিকে থাকা এক স্মৃতি, মাটিতে যার অস্তিত্ব প্রতিদিন একটু একটু করে মুছে যাচ্ছে।

সুন্দরী, কেওড়া, বাইন, গেওয়া- এই গাছগুলোর নাম আজ চকরিয়ার প্রবীণদের মুখেই কেবল শোনা যায়। এক সময় এই বনে ঘুরে বেড়াত রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণের পাল। ব্রিটিশ সরকার ১৯০৩ সালে গুরুত্ব বুঝেই একে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করেছিল। ১৯৫০-এর দশকে প্রায় ২১ হাজার একর জুড়ে বিস্তৃত এই বনভূমির সাড়ে ১৮ হাজার একরই ছিল কঠোর সংরক্ষণের আওতায়।

ইতিহাস বলছে, ধ্বংসের বীজ বোনা হয়েছিল আরও আগে। ১৯২৬ সালে বসতি ও কৃষির নামে প্রায় ১ হাজার ৬০০ হেক্টর বনভূমি ইজারা দেওয়ার মধ্য দিয়েই শুরু হয় মানুষের স্থায়ী আগ্রাসন। তারপর ১৯৮০-এর দশক- চিংড়ি চাষের সোনালি হাতছানি আর রাজনৈতিক দখলদারিত্বের যুগলবন্দিতে বনটি হারাতে শুরু করে নিজের অস্তিত্ব।

আলতাজ আহমদ নামের চকরিয়ার এক প্রবীণ বাসিন্দা কথাগুলো বলেন থেমে থেমে, যেন স্মৃতি হাতড়ে বেদনার হিসাব মেলাচ্ছেন। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে এই এলাকার বন দেখে বড় হয়েছি। আগে চারদিকে অনেক গাছ ছিল। এখন অনেক জায়গায় তাকালে শুধু ঘের আর বাঁধ দেখা যায়। বন যে এভাবে কমে যাচ্ছে, সেটা আমাদের চোখের সামনে ঘটছে।

তার কণ্ঠে ক্ষোভের চেয়ে অসহায়ত্বই বেশি স্পষ্ট। তিনি আরও বলেন, প্রভাবশালী লোকজনের কারণে সাধারণ মানুষ অনেক সময় প্রতিবাদ করতেও ভয় পায়। সরকারি জায়গা হলে সেটি সরকারেরই থাকার কথা। কিন্তু বছরের পর বছর যদি সেখানে দখল ও চাষাবাদ চলতে থাকে, তাহলে মানুষ একসময় সেটাকেই স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে।

তার দাবি- সরকার সরেজমিনে তদন্ত করে দেখুক কোন জমি সংরক্ষিত বন, কোথায় কীভাবে দখল হয়েছে, কার নামে ইজারা। বনটা আমাদের সন্তানদের জন্যও রাখতে হবে।

বন ধ্বংসের হিসাব শুধু গাছের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়- এর আঘাত গিয়ে পড়ছে মাটি আর মানুষের রুটি-রুজিতে। ছুরুত আলম নামের এক কৃষক বলেন, আগে এই এলাকায় জোয়ারের পানি নিয়মিত আসত-যেত। খালগুলোতে মাছ পাওয়া যেত, চারপাশে গাছপালা ছিল। এখন অনেক খাল বাঁধ দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। কোথাও পানি ঢুকতে পারে না, আবার কোথাও পানি বের হওয়ার পথও থাকে না। এতে জমিতে লবণাক্ততা বাড়ে, আবার বর্ষায় পানি আটকে গিয়ে কৃষকেরও ক্ষতি হয়।

তার আশঙ্কা আরও গভীর হিসেবে উল্লেখ তিনি আরও বলেন, বন যদি প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে না থাকে, তাহলে দুর্যোগের দিনে মূল্য দিতে হবে বহুগুণ বেশি। বন থাকলে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় একটা প্রাকৃতিক বাধা পাওয়া যায়। বন এভাবে কেটে ফেলা হলে ভবিষ্যতে বড় দুর্যোগের সময় আমরা আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়ব।

একই সুর শোনা যায় নুরুল আমিন নামের স্থানীয় এক জেলের কণ্ঠেও, যার জীবিকা সরাসরি বাঁধা এই খাল-বনের নাড়িতে। তিনি বলেন, আগে খাল আর বনের আশপাশে অনেক মাছ, কাঁকড়া পাওয়া যেত। জোয়ারের সময় নদী থেকে মাছ খালে ঢুকত, ভাটার সময় আবার বের হয়ে যেত। এখন অনেক জায়গায় বাঁধ দিয়ে পানি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে মাছের চলাচল কমে গেছে। ম্যানগ্রোভের শেকড় যে ছোট মাছ-কাঁকড়ার আশ্রয়স্থল ছিল, ঘের বানাতে গিয়ে সেই আশ্রয়ও উজাড় হয়ে গেছে।

তার আকুতি, খালগুলো খুলে দেওয়া হোক এবং বনের ভেতরে জোয়ার-ভাটার পানি স্বাভাবিকভাবে চলাচল করুক। বন বাঁচলে আমাদের জীবিকাও বাঁচবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ম্যানগ্রোভ বনের প্রাণ জোয়ার-ভাটা। কিন্তু কৃত্রিম বাঁধ দিয়ে সেই স্বাভাবিক জলপ্রবাহ আটকে দেওয়া হয়েছে বহু জায়গায়। শ্বাসমূলযুক্ত গাছ উপড়ে ফেলার ফলে বনের প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন ক্ষমতা প্রায় নিঃশেষ। সরকারি খালের ওপর গড়ে উঠেছে ৫৮টি অবৈধ বাঁধ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনার পরও যার মধ্যে মাত্র ৯টি অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে।

জাহিরুল ইসলাম নামের আরেক স্থানীয় বাসিন্দা এই সংখ্যাতেই সমস্যার গভীরতা খুঁজে পান। তার ভাষ্য, বাঁধ ভেঙে দিলেই কাজ শেষ হয় না- বাঁধগুলো আবার যাতে তৈরি না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। কারা বাঁধ দিয়েছে, কারা ঘের করছে, কারা জমি ব্যবহার করছে, এসব তথ্য প্রকাশ্যে এনে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

তার প্রস্তাব, প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষকেও বন রক্ষার কাজে সম্পৃক্ত করা, কারণ স্থানীয় মানুষই প্রতিদিন দেখতে পায় কোথায় নতুন করে গাছ কাটা হচ্ছে, কোথায় বাঁধ দেওয়া হচ্ছে বা কোথায় বনভূমি দখল হচ্ছে।

ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে রূপ পাল্টায় বলে জানান আরেকজন বাসিন্দা। তিনি বলেন, বর্ষায় কোথাও পানি জমে থাকে, আবার শুষ্ক মৌসুমে কোথাও পানি সংকট তৈরি হয়। এর সঙ্গে লবণাক্ততাও বাড়ছে।

তার সতর্কবার্তা রীতিমতো ভবিষ্যদ্বাণীর মতো শোনায়। তিনি আরও বলেন, চকরিয়া-সুন্দরবন যদি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়, তখন হয়তো এর মূল্য সবাই বুঝবে। কিন্তু তখন আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সহজ হবে না।

তবে অন্ধকারের মধ্যেও একটি আলোর রেখা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-র দায়ের করা জনস্বার্থ রিটের ভিত্তিতে গত ১৯ জুলাই বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি গুরুত্বপূর্ণ রুল জারি করেছে। আদালতের প্রশ্ন সরল অথচ ধারালো- চকরিয়া-সুন্দরবনের ২১ হাজার একরেরও বেশি সংরক্ষিত বনভূমিতে দেওয়া সব অবৈধ ইজারা কেন বাতিল হবে না, আর দখলদার উচ্ছেদে প্রশাসনের রহস্যময় নীরবতা কেন বেআইনি ঘোষিত হবে না?

রিট আবেদনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গেজেটের অপব্যাখ্যা আর নানা প্রশাসনিক কৌশলে সংরক্ষিত বনভূমি ‘অবমুক্ত’ দেখিয়ে তা তুলে দেওয়া হয়েছে প্রভাবশালীদের হাতে- যা সরাসরি বন আইন ১৯২৭ এবং সংবিধানের ১৮এ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। মামলায় বিবাদী করা হয়েছে ভূমি, পরিবেশ, মৎস্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব থেকে শুরু করে কক্সবাজারের ডিসি, এসপিসহ ১৩ জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে।

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বিষয়টিকে দেখছেন আরও বৃহৎ পরিসরে। তার মতে, চকরিয়া-সুন্দরবন শুধু চকরিয়ার একটি বন নয়, এটি পুরো কক্সবাজার উপকূলের জন্য একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেয়াল। দীর্ঘদিন ধরে দখল, অবৈধ লিজ, চিংড়িঘের এবং খালে বাঁধ দেওয়ার কারণে বনটির স্বাভাবিক পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

তিনি সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেন জবাবদিহির অভাবকে।নজরুল বলেন, সংরক্ষিত বনভূমি কীভাবে ধাপে ধাপে ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের আওতায় চলে গেল, সেটি নিয়ে কার্যকর তদন্ত হয়নি। ৫৮ বাঁধের বিপরীতে মাত্র ৯টি অপসারণের পরিসংখ্যান টেনে তিনি বলেন, তাহলে বোঝা যায় সমস্যার গভীরতা কতটা।

সমাধানের পথও নজরুল ইসলামের কাছে স্পষ্ট। শুধু বৃক্ষরোপণ যথেষ্ট নয়। ম্যানগ্রোভ বন বাঁচাতে হলে শুধু গাছ লাগালে হবে না, আগে বনের স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ফিরিয়ে দিতে হবে। অবৈধ লিজ বাতিল, দখলদার উচ্ছেদ এবং খালগুলো পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি বনের সীমানা নতুন করে জরিপ করে সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। হাইকোর্টের রুলকে তিনি স্বাগত জানিয়ে বলেন, প্রশাসন কতটা আন্তরিকতার সঙ্গে তা বাস্তবায়ন করে সেটাই এখন দেখার বিষয়, চকরিয়া-সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, চকরিয়া-সুন্দরবন উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, এবং আদালত ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

স্থানীয়দের মতে, কিন্তু মাটির মানুষের অভিজ্ঞতা আর প্রশাসনিক প্রতিশ্রুতির মাঝে যে ফারাক- ৫৮ বাঁধের বিপরীতে ৯টি অপসারণ, ভাঙা বাঁধ ফের গড়ে ওঠার আশঙ্কা, জবাবদিহিহীন ইজারা প্রক্রিয়া- তা-ই বলে দেয় পথ কতটা বাকি।

চকরিয়া-সুন্দরবন আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে শতবর্ষী প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংসের প্রান্তসীমায়, অন্যদিকে আদালতের হস্তক্ষেপ এক নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে। কৃষক, জেলে, স্থানীয় বাসিন্দা আর নাগরিক সংগঠনের কণ্ঠ একই সুরে বাঁধা- দখলমুক্তি, অবৈধ ইজারা বাতিল আর ব্যাপক বনায়ন এখনই শুরু না হলে, যে প্রজন্ম আজ এই বনের নাম শুনে বিস্মিত হয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো এর অস্তিত্ব সম্পর্কেই কিছু জানবে না। উপকূলের যে বন একদিন ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে মানুষকে আগলে রাখত, আজ সেই বনকেই বাঁচাতে মানুষের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।

Latest articles

এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন মঈন খান

মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদলের আভাস পাওয়া গেছে। নতুন করে কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় যুক্ত করার...

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হতে হবে সমতা-সমমর্যাদার: জামায়াত আমির

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনো ধরনের আধিপত্যের ভিত্তিতে নয়, বরং সমতা, সমমর্যাদা ও...

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর নিয়ে দেওয়া বিবৃতি প্রত্যাহার করল ভারত

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর ঘিরে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের একটি বিজ্ঞপ্তি...

১০ বছর পর আবারও ফাইনালে মুখোমুখি বাংলাদেশ-ভারত

সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে আবারও মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারত। ১০ বছর...

More like this

এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন মঈন খান

মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদলের আভাস পাওয়া গেছে। নতুন করে কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় যুক্ত করার...

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হতে হবে সমতা-সমমর্যাদার: জামায়াত আমির

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনো ধরনের আধিপত্যের ভিত্তিতে নয়, বরং সমতা, সমমর্যাদা ও...

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর নিয়ে দেওয়া বিবৃতি প্রত্যাহার করল ভারত

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর ঘিরে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের একটি বিজ্ঞপ্তি...