শ্রমিক-কর্মচারীদের বিক্ষোভ ও আপত্তির মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টায় ঢাকার আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে ১৫ বছর মেয়াদি এ চুক্তি সই হয়। চুক্তি সম্পাদনে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে ইনভেস্ট বাংলাদেশ।
চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালগুলোর একটি এনসিটি। ২০০৭ সালে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ টার্মিনালে রয়েছে পাঁচটি জেটি। চট্টগ্রাম বন্দরে মোট যে পরিমাণ কনটেইনার ওঠানামা করে, তার প্রায় অর্ধেকই পরিচালিত হয় এই টার্মিনালের মাধ্যমে।
চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছর এনসিটির পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রপাতির মেরামত ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। তবে টার্মিনালের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে। দুই পক্ষ সম্মত হলে ১৫ বছর পর চুক্তির মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগও রাখা হয়েছে।
কীভাবে এ চুক্তি হলো
এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার আলোচনা নতুন নয়। ২০১৯ সাল থেকেই এ বিষয়ে আলোচনা চলছিল। ২০২৩ সালের মার্চে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তি চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নিলেও বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরোধিতা ও ধর্মঘটের মুখে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রক্রিয়াটি স্থগিত করা হয়।
সে সময় অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন বিএনপির নেতারাও। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
তবে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকার আবারও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। চলতি বছরের ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয়। এরপর বৃহস্পতিবার চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনা চূড়ান্ত রূপ পায়।
চুক্তি থেকে কী পাবে বাংলাদেশ
নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, বন্দর ইজারা দেওয়া এবং কনটেইনার পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া এক বিষয় নয়। যারা এটিকে বন্দর ইজারা দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করছেন, তারা চুক্তির বিষয়টি সঠিকভাবে জানেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মন্ত্রীর ভাষ্য, বন্দরের মালিকানা, নিরাপত্তা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কাস্টমস, গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনীর কাছেই থাকবে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে এসব দায়িত্ব হস্তান্তর করা হচ্ছে না।
তিনি জানান, এনসিটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি এবং জাহাজের অপেক্ষার সময় কমিয়ে আনাই সরকারের লক্ষ্য।
চুক্তির আর্থিক দিক তুলে ধরে শেখ রবিউল আলম বলেন, টার্মিনাল আধুনিকায়নে ডিপি ওয়ার্ল্ড ১৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ৬০০ কোটি টাকা সাইনিং মানি পাবে। পাশাপাশি বন্দর থেকে প্রতিবছর ১০ কোটি টাকা পাওয়ার কথা জানান তিনি। তাঁর দাবি, রাজস্বের ৬৭ শতাংশ পাবে সরকার।
মন্ত্রী আরও বলেন, এ চুক্তির ফলে টার্মিনালের কার্যক্রমে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ কমবে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়বে এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।
শ্রমিক-কর্মচারীদের আপত্তি কেন
ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছেন বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের একটি অংশ। গত কয়েক মাসে এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তাঁরা অনশন, বিক্ষোভ ও মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন। বৃহস্পতিবার চুক্তি স্বাক্ষরের সময়ও ইনভেস্ট বাংলাদেশের অডিটরিয়ামের সামনে অবস্থান নেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বিবিসি বাংলাকে বলেন, নির্ধারিত ট্যারিফের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালিত হয়। বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিলে তাদের কমিশন দিতে হবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁর।
হুমায়ুন কবিরের মতে, চট্টগ্রাম বন্দর বর্তমানে সেমি-অটোমেটেড হওয়ায় দেশীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়েই এর সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। তাঁর প্রশ্ন, চট্টগ্রাম বন্দরের পরিবর্তে পায়রা বা মোংলা বন্দরের উন্নয়নে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না কেন?
সক্ষমতা বাড়লেও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ থাকবে
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম মনে করেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে পরিচালনার দায়িত্ব গেলে টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে বন্দরের কিছু মৌলিক সমস্যা সমাধান না হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
তিনি জানান, প্রায় ৭০ শতাংশ কনটেইনার ঢাকামুখী হলেও সেগুলো পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত ল্যান্ড করিডর নেই। রেলপথেও পর্যাপ্ত সুবিধা পাওয়া যায় না। পাশাপাশি জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানোর গতিও বাড়ানো প্রয়োজন।
জাফর আলমের মতে, এসব অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা গেলে বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালনাগত সুবিধা পাওয়া সম্ভব। তবে একই সঙ্গে কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
চাকরি হারানোর আশঙ্কা নিয়ে যা বলছে সরকার
শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা নাকচ করেছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তাঁর দাবি, চুক্তির কারণে শ্রমিকদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ নেই। বরং টার্মিনাল আধুনিকায়ন ও বিদেশি বিনিয়োগের ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে এবং কর্মীদের দক্ষতা বাড়বে।
শ্রমিকদের বিরোধিতা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, যেকোনো পরিবর্তনের সময় মানুষের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়। কারও চাকরি হারানোর ভয় থাকে, আবার কারও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে সব দিক বিবেচনা করেই সরকার এ চুক্তি করেছে।
এখন চুক্তির বাস্তবায়ন, টার্মিনালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, রাজস্ব আয় এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও অধিকার সুরক্ষার বিষয়গুলোই হবে এ উদ্যোগের সাফল্য মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
কুশল/সাএ


