সমুদ্রের মাঝখানে বিশাল একটি জাহাজ। কয়েক লাখ টন ওজনের সেই জাহাজকে থামিয়ে রাখতে পানিতে ফেলা হলো একটি নোঙর। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে—এ তো জাহাজের তুলনায় ছোট্ট একটি লোহার যন্ত্র! কিন্তু বাস্তবে বড় জাহাজের নোঙর মোটেও ছোট নয়। একটি বড় নোঙরের ওজন কয়েক টন হতে পারে, আর তার সঙ্গে যুক্ত থাকে শত শত মিটার দীর্ঘ, অত্যন্ত ভারী ইস্পাতের চেইন।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, জাহাজকে শুধু নোঙরের ওজন ধরে রাখে না। নোঙরের আকৃতি, সমুদ্রতলের মাটিতে তার ‘কামড়ে’ ধরা এবং পানির নিচে ছড়িয়ে থাকা চেইনের ওজন—সব মিলেই তৈরি হয় বিশাল ধরে রাখার শক্তি।
নোঙর আসলে কত ভারী?
সব জাহাজের নোঙরের আকার এক নয়। জাহাজের আকার, ধরন, নকশা এবং ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে নোঙরের ওজন নির্ধারিত হয়। তবে বড় জাহাজের ক্ষেত্রে কয়েক টনের নোঙর অস্বাভাবিক নয়। উদাহরণ হিসেবে, ভাসমান অফশোর উইন্ড টারবাইন স্থাপনের জন্য ব্যবহৃত একটি বিশেষ জাহাজের ক্ষেত্রে প্রতিটি নোঙরের ওজন ১৫ টন পর্যন্ত হতে পারে বলে Damen জানিয়েছে। ওই জাহাজে তিনটি ফ্লোটার স্থাপনের জন্য নয়টি এমন নোঙর এবং তিন মাইলের বেশি চেইন বহনের সক্ষমতা রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ, একটি ১৫ টনের নোঙর মানে প্রায় ১৫,০০০ কেজি লোহার বিশাল কাঠামো!
তবে মনে রাখতে হবে—এটি সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ‘স্ট্যান্ডার্ড’ নোঙরের ওজন নয়; এটি একটি বিশেষ অফশোর ব্যবস্থার উদাহরণ।
আসল দৈত্য কিন্তু নোঙরের সঙ্গে থাকা চেইন!
নোঙর দেখলে যতটা বড় মনে হয়, তার সঙ্গে যুক্ত চেইনের বিষয়টি জানলে বিস্ময় আরও বাড়ে। বড় জাহাজের anchor chain সাধারণ দড়ির মতো নয়। এটি মোটা ইস্পাতের বিশাল লিংক দিয়ে তৈরি। চেইনটি জাহাজের সামনের অংশ থেকে সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত নেমে যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অনেকটা অংশ পানির নিচে ছড়িয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা নথিতেও anchor chain-কে জাহাজের গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম হিসেবে আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়।
আর এই চেইনের ওজনও কম নয়। ফলে একটি বড় জাহাজের anchoring system বলতে শুধু সামনে ঝুলে থাকা নোঙরকে বোঝালে আসল ছবিটাই বাদ পড়ে যায়।
নোঙর পানিতে পড়লেই জাহাজ থেমে যায় না। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রহস্য। অনেকে মনে করেন, নোঙর সমুদ্রের তলায় পড়ে যাওয়ার পর তার ভারে জাহাজ আটকে যায়। বাস্তবে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল। নোঙরের নিচের দিকে থাকা flukes বা ধারালো/চওড়া অংশ সমুদ্রের তলদেশের মাটি বা বালিতে ঢুকে যায়। জাহাজ যখন সামান্য বিপরীত দিকে টান দেয়, তখন সেই অংশ আরও শক্তভাবে তলদেশে বসে যেতে পারে। আর চেইনের একটি বড় অংশ সমুদ্রতলে শুয়ে থাকায় সেটিও জাহাজের টানকে নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাই নোঙরকে বলা যায় এক ধরনের ‘সমুদ্রের নিচের আঁকড়ে ধরা হাত’।

চেইন এত লম্বা রাখা হয় কেন?
এখানেই রয়েছে নোঙর ব্যবস্থার সবচেয়ে চমকপ্রদ কৌশল। জাহাজ যদি নোঙর ফেলার পর চেইনকে একেবারে সোজা করে টান দেয়, তাহলে নোঙরের ওপর প্রচণ্ড টান পড়তে পারে। কিন্তু পর্যাপ্ত চেইন পানিতে ছাড়লে তার একটি বড় অংশ সমুদ্রের তলায় বক্রভাবে পড়ে থাকে।
ফলে জাহাজ বাতাস বা স্রোতের কারণে নড়াচড়া করলে প্রথম ধাক্কাটা সরাসরি নোঙরের ওপর পড়ে না।
অর্থাৎ—নোঙর + চেইনের ওজন + চেইনের অবস্থান + সমুদ্রতলের সঙ্গে নোঙরের গ্রিপ = anchoring system-এর শক্তি।
বড় জাহাজে নোঙর তোলা ও নামানোর জন্য windlass নামে শক্তিশালী যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। বড় জাহাজে নোঙর নামানোর সময় নিয়ন্ত্রিতভাবে চেইন ছাড়ার পদ্ধতিও ব্যবহৃত হয়।
এত বড় জাহাজকে নোঙর কি সত্যিই এক জায়গায় আটকে রাখতে পারে?
এখানে আরেকটি ভুল ধারণা দূর করা দরকার। নোঙর কোনো জাহাজকে পাথরের সঙ্গে পেরেক দিয়ে আটকে রাখে না। বরং নোঙর জাহাজের চলাচল সীমিত করে। বাতাস, ঢেউ ও স্রোতের প্রভাবে জাহাজ নোঙরের চারপাশে কিছুটা ঘুরতে পারে। তাই নোঙর করার সময় জাহাজের আকার, পানির গভীরতা, তলদেশের ধরন, আবহাওয়া এবং কতটা চেইন ছাড়তে হবে—সবকিছু হিসাব করা হয়।
বিশেষ করে ঝড়ো আবহাওয়ায় ভুল anchoring অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। IMO-র নথিতেও anchoring operation-এর ক্ষেত্রে জাহাজের চলাচল, চেইনের বিন্যাস এবং শক্তিশালী বাতাস/স্রোতের প্রভাব বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।

নোঙর তোলা হয় কীভাবে?
ভাবুন, কয়েক টন ওজনের একটি লোহার নোঙর সমুদ্রের তলায় আটকে আছে। সেটিকে এবার আবার জাহাজের ডেকে তুলতে হবে। এ কাজ মানুষের হাতে করা সম্ভব নয়। জাহাজের সামনের অংশে থাকে শক্তিশালী anchor windlass। বিশাল মোটরচালিত এই যন্ত্র চেইনকে ধীরে ধীরে টেনে ওপরে তোলে। বড় জাহাজে anchoring operation-এর সময় চেইনের ওপর কতটা চাপ পড়ছে, জাহাজের গতি কত, বাতাস ও স্রোত কোন দিকে—এসবও গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ, নোঙর ফেলা যতটা সহজ মনে হয়, তোলা তার চেয়েও বেশি নিয়ন্ত্রিত একটি অপারেশন।
আরেক ধরনের নোঙর আরও বিশাল!
এবার আসল চমক
সমুদ্রের গভীরে স্থায়ীভাবে স্থাপন করা offshore structures—যেমন ভাসমান তেল-গ্যাস প্ল্যাটফর্ম বা floating wind turbine—এর anchoring system-এর নোঙর সাধারণ জাহাজের নোঙরের চেয়েও বিশাল হতে পারে। Damen-এর তথ্য অনুযায়ী, বড় offshore structure-এর mooring chain-এর ব্যাস সাধারণত প্রায় ১৫২ মিলিমিটার হতে পারে এবং কিছু ব্যবস্থায় তা ২২০ মিলিমিটারের বেশি পর্যন্ত যেতে পারে।
অর্থাৎ, এমন চেইনের একটি লিংক দেখলেই বোঝা যায়—এটি কোনো সাধারণ জাহাজের চেইন নয়।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, একটি বিশাল জাহাজকে ধরে রাখার কাজটি আসলে একটি নোঙর একা করে না।
এটি একটি পুরো ব্যবস্থার সমন্বিত কাজ—নোঙর সমুদ্রতলের মাটিতে আঁকড়ে ধরে, চেইন জাহাজের টান নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, windlass চেইনকে নিয়ন্ত্রিতভাবে নামায় ও তোলে, আর নাবিক সিদ্ধান্ত নেন কোথায়, কখন এবং কীভাবে নোঙর করতে হবে।
তাই কয়েক লাখ টন ওজনের একটি জাহাজের সামনে থাকা কয়েক টনের নোঙরকে ছোট মনে হলেও, তার সঙ্গে যুক্ত পুরো anchoring system-টি আসলে প্রকৌশলের এক অসাধারণ উদাহরণ। নোঙর যতটা বড়, তার চেয়েও বড় হলো এর কাজ। সমুদ্রের ঢেউ, বাতাস ও স্রোতের মধ্যে একটি বিশাল জাহাজকে নির্দিষ্ট এলাকায় ধরে রাখার পেছনে কাজ করে টন ওজনের লোহার নোঙর, শত শত মিটার ইস্পাতের চেইন এবং অত্যন্ত নিখুঁত সামুদ্রিক নেভিগেশন।
সমুদ্রের ওপর ভাসতে থাকা বিশাল জাহাজটির নিচে তখন যেন আরেকটি অদৃশ্য ব্যবস্থা কাজ করে—সমুদ্রের তলদেশকে আঁকড়ে ধরে রাখা এক বিশাল লোহার হাত।
বাপ্পি/সা.এ


