Homeসর্বশেষমিষ্টি খেয়েও কীভাবে ৩৫ কেজি ওজন কমালেন মাল্লিকা?

মিষ্টি খেয়েও কীভাবে ৩৫ কেজি ওজন কমালেন মাল্লিকা?

Published on

spot_img

ওজন কমাতে চান? তাহলে প্রথমেই কি মিষ্টি, বিরিয়ানি, পিৎজা কিংবা প্রিয় সব খাবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ধারণাই যেন প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু কনটেন্ট ক্রিয়েটর মাল্লিকা ফতেহপুরিয়ার গল্প বলছে অন্য কথা। ৯০ কেজি থেকে ৫৫ কেজিতে নেমে আসার দীর্ঘ যাত্রায় তিনি নাকি প্রতিদিনই মিষ্টি খেয়েছেন। তবু কমেছে ওজন।

সম্প্রতি নিজের ওজন কমানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৩৫টি শিক্ষা শেয়ার করেছেন মাল্লিকা। তাঁর সেই পোস্টের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে হিন্দুস্তান টাইমস। সেখানে উঠে এসেছে খাবার, ব্যায়াম, ক্যালরি, মানসিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস নিয়ে বেশ কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা।

মিষ্টি খেলেই ওজন বাড়ে—ধারণাটি কি ভুল?

মাল্লিকার অভিজ্ঞতার সবচেয়ে আলোচিত দিক সম্ভবত এটিই—মিষ্টি পুরোপুরি বাদ না দিয়েও ওজন কমানো সম্ভব।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ইচ্ছেমতো মিষ্টি খেলেই ওজন কমবে। বরং তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ। কোনো প্রিয় খাবারকে ‘নিষিদ্ধ’ করে দেওয়ার পরিবর্তে সেটিকে নিজের খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে কীভাবে পরিমিতভাবে রাখা যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর মতে, স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই বিস্বাদ খাবার নয়। পছন্দের অনেক খাবারই কম ক্যালরিতে তৈরি করা যায়। রান্নায় তেল ও মাখনের পরিমাণ কমানো, মাপার চামচ ব্যবহার করা কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ ওজন করে নেওয়া—এসব ছোট অভ্যাস বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

আর তাই তাঁর পরামর্শ—পছন্দের ১০ থেকে ১৫টি খাবারকে এমনভাবে তৈরি করতে শেখা, যাতে সেগুলো তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর ও কম ক্যালরির হয়।

‘ডায়েট’ নয়, এমন অভ্যাস যা সারা জীবন চালানো যায়

দুই সপ্তাহ, এক মাস কিংবা তিন মাস কঠোর ডায়েট করে ওজন কমিয়ে আবার আগের খাবারে ফিরে গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল ধরে রাখা কঠিন। মাল্লিকার অভিজ্ঞতায়, ওজন কমানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি খাদ্যাভ্যাস তৈরি করা, যা দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করা সম্ভব। অর্থাৎ, যে ডায়েট করতে গিয়ে প্রতিদিন মনে হবে ‘আর পারছি না’, সেটি হয়তো আপনার জন্য সঠিক পরিকল্পনা নয়।

খাবারকে ‘ভালো’ আর ‘খারাপ’—এভাবে ভাগ করে দেখারও প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন তিনি। বরং কী পরিমাণ খাচ্ছেন, কত ঘন ঘন খাচ্ছেন এবং পুরো দিনের খাদ্যাভ্যাস কেমন—সেদিকেই নজর দেওয়া বেশি জরুরি।

‘হেলদি’ লেখা থাকলেই খাবার স্বাস্থ্যকর নয়

সুপারমার্কেটের তাকজুড়ে এখন ‘হেলদি’, ‘লো-ফ্যাট’, ‘ফিট’ কিংবা ‘ডায়েট’ লেখা অসংখ্য খাবার। কিন্তু প্যাকেটের গায়ে এমন শব্দ দেখেই খাবারটি স্বাস্থ্যকর ধরে নেওয়া ঠিক নয়। মাল্লিকার পরামর্শ, প্যাকেটজাত খাবার কেনার আগে এর পুষ্টি উপাদানের তালিকা পড়ার অভ্যাস করতে হবে। খাবারে কত ক্যালরি, কত চিনি, ফ্যাট ও অন্যান্য উপাদান রয়েছে—সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।

কারণ ‘স্বাস্থ্যকর’ খাবারও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খেলে ওজন কমানোর লক্ষ্যে বাধা তৈরি করতে পারে।

একদিন বেশি খেলে সব পরিশ্রম শেষ?

ধরুন, কয়েক সপ্তাহ ধরে নিয়ম মেনে খাওয়ার পর একদিন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বাইরে গিয়ে একটু বেশি খেয়ে ফেললেন। এরপর অনেকেই ভাবেন—‘সব শেষ! আবার সোমবার থেকে শুরু করব।’ মাল্লিকা এই মানসিকতার বিরোধী।

তাঁর মতে, একটি দিন বেশি খাওয়া কয়েক মাসের পরিশ্রম মুছে দিতে পারে না। বরং ভুল হয়ে গেলে পরের খাবার থেকেই স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে আসাই ভালো। এমনকি আলাদা করে ‘চিট মিল’ রাখতেই হবে—এমন কোনো নিয়মও নেই বলে মনে করেন তিনি।

ছবি: সংগৃহীত

ওজন কমার সঙ্গে সঙ্গে বদলায় মানুষের চোখেও আপনি

ওজন কমানো মানেই শুধু শরীরের মাপ বদলানো নয়। বদলে যায় আশপাশের মানুষের মন্তব্যও। মাল্লিকার অভিজ্ঞতায়, ওজন কমানোর পর কেউ হয়তো বলবেন আপনি এখনও মোটা, আবার কেউ মনে করবেন আপনি অতিরিক্ত রোগা হয়ে গেছেন। অর্থাৎ অন্যের চোখে ‘সঠিক’ শরীরের কোনো শেষ নেই। তাই অন্যের পছন্দ অনুযায়ী শরীর পরিবর্তন করার চেয়ে নিজের শরীর নিয়ে সুস্থ ও স্বস্তিতে থাকাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এই জায়গাতেই তাঁর অভিজ্ঞতা ওজন কমানোর প্রচলিত গল্প থেকে একটু আলাদা। তাঁর কাছে পরিবর্তনের লক্ষ্য শুধু দাঁড়িপাল্লায় কম সংখ্যা পাওয়া নয়; নিজের শরীর ও নিজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও বদলানো।

প্রতিদিন ব্যায়াম করার ইচ্ছা থাকবে না—এটাই স্বাভাবিক

জিমে যাওয়ার প্রথম কয়েক দিন উৎসাহ থাকে। নতুন পোশাক, নতুন জুতা, নতুন রুটিন—সবই বেশ ভালো লাগে। কিন্তু কিছুদিন পরই সেই উৎসাহ কমে যায়। মাল্লিকার মতে, এখানেই অনুপ্রেরণা আর অভ্যাসের পার্থক্য। প্রতিদিন ব্যায়াম করার মোটিভেশন থাকবে—এমনটা বাস্তবসম্মত নয়। তাই অনুপ্রেরণার অপেক্ষা না করে নিয়মিত থাকার অভ্যাস তৈরি করতে হবে।

ব্যায়াম ভালো লাগতেই হবে, এমনও নয়। কোনো দিন সময় কম থাকলে হাঁটাহাঁটি করা যেতে পারে। তাঁর মতে, সামান্য শারীরিক কর্মকাণ্ডও একেবারে নিষ্ক্রিয় থাকার চেয়ে ভালো।

ওজন কমানোর যাত্রায় নতুন নতুন সরঞ্জাম কেনাকে অনেকেই সাফল্যের প্রথম ধাপ মনে করেন। মাল্লিকার অভিজ্ঞতা বলছে, বিষয়টি এতটা জটিল নয়। ব্যায়ামের জন্য সবসময় নতুন পোশাক কিংবা দামি সরঞ্জামের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন হলো নিয়মিত শরীরচর্চা করার মানসিকতা। অবশ্য নিজের প্রয়োজন বুঝে প্রশিক্ষক বা পুষ্টিবিদের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে খাদ্যাভ্যাস বা ব্যায়ামের ক্ষেত্রে ব্যক্তিভেদে প্রয়োজন আলাদা হওয়ায় বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।

ওজন কমার পর আগের বড় মাপের পোশাকগুলো ফেলে দিতে অনেকেরই ইচ্ছে করে। কিন্তু মাল্লিকার একটি মজার পরামর্শ—এগুলো রেখে দিন। কারণ একসময় সেই পোশাকই আপনার পরিবর্তনের দৃশ্যমান প্রমাণ হয়ে উঠতে পারে। কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর পুরোনো পোশাক হাতে নিয়ে নিজের পরিবর্তন চোখে দেখা—এটিও হতে পারে বড় ধরনের অনুপ্রেরণা।

আয়নায় প্রতিদিন নিজেকে ভালো লাগবে না

ওজন কমানোর পথ সবসময় আত্মবিশ্বাসে ভরা থাকবে—এমন নয়। কোনো দিন আয়নায় নিজেকে দেখে ভালো লাগবে, আবার কোনো দিন নিজের চেহারা নিয়েই অস্বস্তি হতে পারে। মাল্লিকার মতে, এটিও স্বাভাবিক। কারণ শরীর বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে নিজের শরীর সম্পর্কে মানসিক ধারণাও বদলাতে সময় লাগে। তাই প্রতিদিনের ছোট পরিবর্তনকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং নিজের অগ্রগতির জন্য নিজেকে কৃতিত্ব দেওয়া জরুরি।

মাল্লিকার ৩৫টি অভিজ্ঞতাকে এক কথায় বলতে গেলে—ওজন কমানো মানে নিজের পছন্দের সবকিছু ত্যাগ করা নয়; বরং পরিমাণ, অভ্যাস ও ধারাবাহিকতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। মিষ্টি খাওয়া যাবে, কিন্তু পরিমাণ বুঝে। পছন্দের খাবার খাওয়া যাবে, তবে পুরো খাদ্যাভ্যাসের হিসাব মাথায় রেখে। কোনো দিন বেশি খাওয়া হয়ে গেলে পরের দিন নিজেকে শাস্তি না দিয়ে আবার নিয়মে ফিরতে হবে। ব্যায়ামে প্রতিদিন অনুপ্রেরণা না থাকলেও অভ্যাসটা ধরে রাখতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—ওজন কমানোর লক্ষ্য যেন শুধু অন্যের চোখে ‘সুন্দর’ বা ‘পাতলা’ দেখানো না হয়।

মাল্লিকার অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণাদায়ক হলেও এটি তাঁর ব্যক্তিগত ওজন কমানোর গল্প। তাঁর ৩৫টি শিক্ষা সবার জন্য একইভাবে কার্যকর হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। হিন্দুস্তান টাইমস-এর প্রতিবেদনেও এ বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া তাঁর তথ্যগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি এবং এগুলো চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। ওজন কমানোর পরিকল্পনা ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা, জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তাই দ্রুত ওজন কমানোর কোনো কঠোর পদ্ধতি অনুসরণ না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

মাল্লিকার গল্পের সবচেয়ে বড় বার্তাটি তাই হয়তো ‘মিষ্টি খেয়েও ওজন কমানো যায়’ নয়। বরং—ওজন কমানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো এমন অভ্যাস তৈরি করা, যা শুধু কয়েক মাস নয়, দীর্ঘদিন ধরে নিজের জীবনের অংশ হয়ে থাকতে পারে।



বাপ্পি/সা.এ

Latest articles

১১ দলীয় ঐক্যের জরুরি সভা, লংমার্চ নিয়ে এলো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণসহ সাত...

মোটরসাইকেলসহ গাড়ি মালিকদের জন্য সুখবর, চালকদের জন্য দুঃসংবাদ

মোটরসাইকেল ও গাড়ির মালিক-চালকদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির খবর দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন...

দুর্গাপূজায় এবার টানা ৫ দিনের ছুটি

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে এবার টানা পাঁচদিনের ছুটি পাচ্ছেন...

ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ডিএমপির ২৭৫১ মামলা, ডাম্পিং ৭৩৭ গাড়ি

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযান চালিয়ে ২ হাজার ৭৫১টি মামলা...

More like this

১১ দলীয় ঐক্যের জরুরি সভা, লংমার্চ নিয়ে এলো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণসহ সাত...

মোটরসাইকেলসহ গাড়ি মালিকদের জন্য সুখবর, চালকদের জন্য দুঃসংবাদ

মোটরসাইকেল ও গাড়ির মালিক-চালকদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির খবর দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন...

দুর্গাপূজায় এবার টানা ৫ দিনের ছুটি

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে এবার টানা পাঁচদিনের ছুটি পাচ্ছেন...