Homeসর্বশেষ‘যে কোনো মানদণ্ডেই ইরান যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে আমেরিকা’

‘যে কোনো মানদণ্ডেই ইরান যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে আমেরিকা’

Published on

spot_img

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে “জয়ী” হয়েছে এবং এখন শুধু “কাজটি শেষ করা” বাকি—এমন দাবি করার কয়েক মাস পরও সংঘাতটি গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা স্থবির, কৌশলগত লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়নি এবং প্রায় সব মানদণ্ডেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কার্যত এই যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে বলে ফরেন পলিসি জানিয়েছে।

গত বুধবার ট্রাম্প বলেছেন, “আশা করছি আমরা যুদ্ধের সমাপ্তির কাছাকাছি রয়েছি” এবং দাবি করেন যে তেহরান একটি চুক্তি চায়। তবে মার্কিন এই সাময়িকী উল্লেখ করেছে, এমন আশাবাদ বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

কৌশলগত কিছু হামলা চালানো হলেও বৃহত্তর এই সামরিক অভিযান ওয়াশিংটনের জন্য একটি কৌশলগত বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধটি মার্কিন সামরিক অবস্থানের গুরুতর দুর্বলতাগুলো উন্মোচিত করেছে, দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে, মার্কিন করদাতাদের আনুমানিক ৩৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে এবং একটি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করেছে। অভ্যন্তরীণভাবেও যুদ্ধের বিরোধিতা বাড়ছে। কংগ্রেসের ক্রমবর্ধমান সংখ্যক রিপাবলিকান সদস্য যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে ভোট দিচ্ছেন এবং একজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা যুদ্ধ পরিচালনার বিষয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাবও উত্থাপন করেছেন।

ইউরেশিয়া গ্রুপের ইরান-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রু বলেন, “আপনি যদি ফেব্রুয়ারিতে ফিরে গিয়ে দেখেন, যুক্তরাষ্ট্র কী করার কথা বলেছিল, তাহলে দেখা যাবে যে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রধান কৌশলগত লক্ষ্যগুলো অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।”

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমাতে কিংবা তার মিত্র প্রতিরোধ শক্তিগুলোকে দুর্বল করতে ব্যর্থ হয়েছে। ট্রাম্প এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন প্রথম দিকে দাবি করেছিলেন যে মার্কিন অভিযান তেহরানের শক্তি প্রক্ষেপণের সক্ষমতা ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু এর বিপরীতে আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলো তাদের কার্যক্রমের পরিধি আরও বিস্তৃত করেছে।

ইয়েমেনে আনসারুল্লাহ বাহিনী সম্প্রতি লোহিত সাগরের উপকূল বরাবর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তারা আল-মুখা (মোখা) বন্দরনগরী এবং মায়ুন (পেরিম) দ্বীপের কৌশলগত অবস্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে এই আন্দোলন কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। চলমান হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে যে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, এর ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরবের সঙ্গে সীমান্তজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলা বেড়েছে। সম্প্রতি সৌদি আরবের ৭৫০ মাইল দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে একটি ড্রোন হামলার ফলে বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ বন্ধ হয়ে যায়।

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অবকাঠামোর বিরুদ্ধে পেন্টাগনের অভিযানও থমকে গেছে। এপ্রিল মাসে হেগসেথ দাবি করেছিলেন যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কার্যত ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু মার্কিন সম্পদ থাকা আঞ্চলিক স্থাপনাগুলোতে নিয়মিত হামলা প্রমাণ করে যে তেহরানের হাতে এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্যকর সামরিক সক্ষমতা রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইরান গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আবারও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু করেছে। এসব স্থাপনা আকাশ থেকে বোমাবর্ষণের ক্ষেত্রে অনেকাংশেই অভেদ্য। একই সঙ্গে কম খরচের উৎপাদন পদ্ধতি ব্যবহার করায় দীর্ঘমেয়াদি পশ্চিমা বাধাদান কার্যক্রম অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে।

এ ছাড়া, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির বিষয়ে ওয়াশিংটনের প্রাথমিক লক্ষ্যও ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনেয়ীর শাহাদাতের পরও দেশটির শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি অক্ষুণ্ন রয়েছে এবং আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।

পরমাণু ইস্যুতেও হোয়াইট হাউস আগে দাবি করেছিল যে তারা ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতার মধ্যে প্রশাসন ধীরে ধীরে এই বিষয়টিকে কম গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে এবং নৌ অবরোধ ও “অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট” নামে পরিচিত একটি আর্থিক অভিযানের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে ইরানকে চেপে ধরার কৌশলের দিকে ঝুঁকেছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই উদ্যোগকে “প্রতিটি অর্থনৈতিক জীবনরেখা বিচ্ছিন্ন করার” প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে তেহরানের প্রতিরোধের ইতিহাস বিবেচনায় অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে ইরানকে কূটনৈতিক ছাড় দিতে বাধ্য করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত এই সংঘাত হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে একটি ক্ষয়িষ্ণু অর্থনৈতিক যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। সেখানে সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল যুদ্ধের আগের মাত্রার প্রায় এক-পঞ্চমাংশে নেমে এসেছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৪ ডলারের ওপরে উঠে গেছে, যেখানে সংঘাতের আগে এর দাম ছিল ৭২ ডলার। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হয়েছে। যুদ্ধ অষ্টম মাসের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হোয়াইট হাউসের ওপর চাপ ও সীমাবদ্ধতাও ক্রমশ বাড়ছে।

সূত্র-পার্সটুডে



সাজু/নিএ

Latest articles

এআই নিয়ন্ত্রণে হাতে আর মাত্র এক বছর, সতর্ক করলেন ‘এআই গডফাদার’

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে হয়তো আর মাত্র...

বাউফলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার হুমকি, বিএনপি নেতা গ্রেপ্তার

পটুয়াখালীর বাউফলে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও এক ব্যবসায়ীকে জীবিত পুড়িয়ে মারার হুমকি...

৩৩ মাস কারাভোগের পর ভারতে আটক ৩ বাংলাদেশির প্রত্যাবর্তন

অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের দায়ে আটক এক নারীসহ তিন বাংলাদেশি ৩৩ মাস ভারতীয় কারাগারে...

খালে দূষণ নিয়ে ‘ভুল তথ্য’: বিএনপি নেতাকে প্রকাশ্যেই শাসালেন এমপি

‘দুর্গন্ধ নেই' এমন তথ্য দেওয়ার অভিযোগে পটিয়ায় এক বিএনপি নেতা সেলিম উদ্দিনকে প্রকাশ্যেই...

More like this

এআই নিয়ন্ত্রণে হাতে আর মাত্র এক বছর, সতর্ক করলেন ‘এআই গডফাদার’

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে হয়তো আর মাত্র...

বাউফলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার হুমকি, বিএনপি নেতা গ্রেপ্তার

পটুয়াখালীর বাউফলে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও এক ব্যবসায়ীকে জীবিত পুড়িয়ে মারার হুমকি...

৩৩ মাস কারাভোগের পর ভারতে আটক ৩ বাংলাদেশির প্রত্যাবর্তন

অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের দায়ে আটক এক নারীসহ তিন বাংলাদেশি ৩৩ মাস ভারতীয় কারাগারে...