বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য, বহুজাতিক করপোরেশনের মুনাফাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজধানীতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ শুক্রবার ১৬ অক্টোবর সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক নাগরিক সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশসহ ৩৬টি নাগরিক ও সামাজিক সংগঠনের সম্মিলিত উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
১২–১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ–বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান বৈষম্য ও বহুজাতিক করপোরেশনের মুনাফাকেন্দ্রিক নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।
মানববন্ধনে বক্তারা প্রশ্ন তোলেন, বিশ্ব অর্থনীতি কি মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি ও বহুজাতিক করপোরেশনের মুনাফার স্বার্থে পরিচালিত হবে, নাকি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন ও জীবিকার নিশ্চয়তা নিশ্চিত করবে?
ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ – এর গবেষণা প্রধান, মো: ইকবাল ফারুক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি আমাদেরই বহন করতে হয়। অথচ ঋণ সহায়তার নামে চাপিয়ে দেওয়া অর্থনৈতিক বোঝা মানুষের মৌলিক অধিকারকে সংকুচিত করছে। আমরা কৃষক, নারী, শিশুসহ সর্বস্তরের মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানাই।
বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন – এর সভাপতি, বদরুল আলাম বলেন, ন্যায্য ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমরা আন্দোলন ও গণসচেতনতা গড়ে তুলছি। বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ২ শতাংশ, যা পর্যাপ্ত নয়। আমরা তা ক্রমান্বয়ে ৪০ শতাংশ থেকে শতভাগে উন্নীত করতে চাই। সরকারের পরিকল্পনা ও সদিচ্ছার বাস্তবায়ন দেখতে চাই।
সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষ জলবায়ু সংকট, ঋণের বোঝা, সুপেয় পানির অভাব, লবণাক্ততা ও জীবিকা সংকটে বিপর্যস্ত। তাই, জলবায়ু ক্ষয়ক্ষতির জন্য ঋণ নয়, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। উপকূল সুরক্ষা, নিরাপদ পানি, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সুন্দরবন, নদী, খাল ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে। কৃষক, জেলে ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি গড়ে তুলতে হবে। উন্নয়নের নামে উচ্ছেদ নয়, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মুনাফার পৃথিবী নয়, মানুষের পৃথিবী গড়তে হবে। উপকূল বাঁচাতে জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক ও ড্রিম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান, মীর মোহাম্মদ আলী বিশ্বব্যাংকের তথ্য তুলে ধরে বলেন, মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান মাত্র ০.৪ শতাংশ। অথচ জলবায়ুর পরিবর্তনশীলতা ও চরম দুর্যোগে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের কৃষি খাতের অর্থনৈতিক উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ বা প্রায় ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে। জলবায়ুর প্রভাবে একই সময়ের মধ্যে প্রায় এক কোটি ৩৩ লাখ মানুষ দেশের ভেতরে স্থানান্তরিত হতে পারেন। এই সংকটের মূল্য দিচ্ছেন আমাদের কৃষক, জেলে ও শ্রমজীবী মানুষ। ঐতিহাসিকভাবে অধিক নিঃসরণকারী দেশগুলোকে দায় স্বীকার করে ঋণের পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সেই অর্থ দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। ন্যায্য ক্ষতিপূরণ কোনো দয়া নয়, এটি তাঁদের অধিকার।
গর্জন সমাজ কল্যাণ সংস্থা থেকে ফারজানা উর্মি বলেন, জলবায়ু সংকটের প্রভাব ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ হবে। পানি দূষণ, উপকূলীয় জেলে ও লবণচাষিদের জীবিকা হারানো এবং সুন্দরবনের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে কার্যকর সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
মানববন্ধন থেকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার সুরক্ষা এবং জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
সালাউদ্দিন/সাএ


