হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দূর্গাপূজা উদযাপন উপলক্ষে দেশের সর্ববৃহৎ ঢাকের হাট বসেছে কটিয়াদীতে। ঢাকের গম্ভীর আওয়াজ, কাঁসরের ঝংকার আর সানাইয়ের সুরে মুখর কটিয়াদী। প্রায় ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাটে বসেছে ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের মিলনমেলা। বাদকদের ছন্দময় পরিবেশনায় উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ হাট যেন বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
বৃহস্পতিবার (১৫ নভেম্বর) সকাল থেকে শুরু হওয়া এ হাট চলবে শুক্রবার পর্যন্ত। দুর্গাপূজার আগে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা তাঁদের দলবল নিয়ে হাজির হয়েছেন কটিয়াদীতে। পূজামণ্ডপে বাদ্য পরিবেশনের চুক্তি করতে তাঁদের নৈপুণ্য যাচাই করছেন আয়োজকেরা। ঢাক-ঢোলের তালে তালে হাটজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
নাম ঢাকের হাট হলেও এখানে মূলত বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। দুর্গাপূজার আয়োজক ও বাদকদলের মধ্যে চুক্তি সম্পাদনই এ হাটের প্রধান উদ্দেশ্য। ঢাক, ঢোল, কাঁসর, সানাই, বাঁশি, করতাল ও খঞ্জনির তালে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরেন শিল্পীরা। তাঁদের পরিবেশনা শুনে পছন্দের দল নির্বাচন করেন পূজামণ্ডপের আয়োজকেরা।
বাদকদের দক্ষতা, দলের সদস্যসংখ্যা ও পরিবেশনার মান অনুযায়ী চুক্তিমূল্য নির্ধারিত হয় ১০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত। কেরানীগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, ঢাকার নবাবগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাদকদল এখানে আসেন। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারে মুঠোফোনে অনেক চুক্তি সম্পন্ন হলেও সরাসরি বাজনা শুনে পছন্দের দল বেছে নিতে এখনও হাটে আসেন অনেক আয়োজক।
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে স্থানীয় সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় সেরা ঢাকিদের খুঁজে বের করতে এ হাটের প্রচলন করেন। কথিত আছে, তিনি নিজে ঢাকিদের বাজনা শুনে সেরা দল নির্বাচন করতেন। সেই থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে আছে এ ঐতিহ্য।
দীর্ঘদিনের এ আয়োজন এখন আর শুধু পূজার বাদ্যশিল্পীদের চুক্তির স্থান নয়; এটি বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। ধর্ম-বর্ণের গণ্ডি পেরিয়ে এ হাট বাঙালির সম্প্রীতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছে।
প্রায় চার শতাব্দীর ঐতিহ্য ধারণ করলেও হাটে আসা ঢাকিদের রয়েছে নানা আক্ষেপ। তাঁদের বিশ্রামের জন্য সরকারি সহায়তায় একটি বিশ্রামাগার নির্মাণ করা হলেও সেটি অসম্পূর্ণ ও ব্যবহার অনুপযোগী অবস্থায় পড়ে রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে দূরদূরান্ত থেকে আসা বাদকদের বিশ্রাম ও অবস্থান নিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে এ হাটে আসতে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক শিল্পী।
কটিয়াদী পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দিলীপ সাহা বলেন এই ঢাকের হাট ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির মিলনমেলায় পরিণত হয়। তিনি জানান, স্থানীয় প্রশাসন ও পূজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে বাদকদলগুলোর থাকা-খাওয়া, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।
কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, পূজার আয়োজক ও বাদকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। হাটে পুলিশের একটি মোবাইল টিম দায়িত্ব পালন করছে।
কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে। সুশৃঙ্খল পরিবেশে হাটের কার্যক্রম সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন বলেন, কটিয়াদীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় হাটের স্থানটি ময়লা-আবর্জনায় ভরপুর ছিল। ইতোমধ্যে জায়গাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। ঢাকিদের ব্যবহারের জন্য একটি শৌচাগার নির্মাণে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকার দেশের প্রতিটি সংসদীয় আসনে সনাতন ধর্মাবলম্বী অসচ্ছল নারীদের জন্য ৩০০টি করে শাড়ি বরাদ্দ দিয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি পূজামণ্ডপে ৬০০ কেজি করে চাল দেওয়া হবে। কটিয়াদীর ঐতিহাসিক ঢাকের হাটের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে এর উন্নয়ন ও সংস্কারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ঢাকের তালে, কাঁসরের ঝংকারে আর সানাইয়ের সুরে কটিয়াদীর এ ঐতিহ্যবাহী হাট প্রতিবছরই নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। তবে এ ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হলে বাদকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাটের অবকাঠামোগত উন্নয়নেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
সাজু/নিএ


