আইনের কঠোরতা থেকে অপরাধের বিচার—মাঝখানের দীর্ঘ পথেই কি আটকে যাচ্ছে ন্যায়বিচার?
বাংলাদেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। আইন আছে, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আছে, তদন্তকারী সংস্থা আছে, আছে বিচারপ্রার্থীর জন্য আইনি সহায়তার ব্যবস্থাও। তবু যৌন সহিংসতার ঘটনা সামনে এলে জনমনে বারবার ফিরে আসে একই প্রশ্ন—আইন যদি এত কঠোর হয়, তাহলে অপরাধ বন্ধ হচ্ছে না কেন? আর বিচার চাইতে গিয়ে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারকে কেন বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু অপরাধের ভয়াবহতা কিংবা অপরাধীর সম্ভাব্য শাস্তির দিকে তাকালে চলবে না। দেখতে হবে, অভিযোগ দায়েরের পর রাষ্ট্র কত দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করছে, প্রমাণ কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে সংগ্রহ করছে, সাক্ষীকে কতটা সুরক্ষা দিচ্ছে এবং আদালতে বিচার কতটা কার্যকরভাবে এগোচ্ছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি মামলার অগ্রগতি এবং বিচারাধীন মামলার পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ শুধু কঠোর শাস্তির বিধান রাখা নয়; বরং অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করা।
১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের ওপর যৌন সহিংসতার অভিযোগকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও নারীর নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি করে।
ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত জসিমউদ্দীন মানিক ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে সমকালীন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যায়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেন। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কয়েকজনকে বহিষ্কার করলেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ফৌজদারি মামলা করা হয়নি বলে ২০১৭ সালে বেসরকারি গণমাধ্যম-এ প্রকাশিত একটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাভিত্তিক নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়।
এই ঘটনার গুরুত্ব শুধু অতীতের একটি ক্যাম্পাস কেলেঙ্কারিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেখায়, কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আর রাষ্ট্রের ফৌজদারি বিচার এক বিষয় নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার করা হলেও অপরাধের অভিযোগের বিচার আদালতে না হলে জবাবদিহির প্রশ্নটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
পরবর্তী বছরগুলোতেও দেশের বিভিন্ন স্থানে যৌন সহিংসতার ঘটনায় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক চাপ কিংবা তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে বৃহত্তর উদ্বেগটি স্পষ্ট: অপরাধের অভিযোগ উঠলে অভিযুক্তের পরিচয় বা ক্ষমতা যেন তদন্ত ও বিচারের গতিপথ নির্ধারণ করতে না পারে।
বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য একটি পরিসংখ্যানই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর বেসরকারি গণমাধ্যম-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের ১০১টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মোট ১ লাখ ১৬ হাজার ৩৯২টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ২৬ হাজার ২৪৯টি মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল।
এই সংখ্যাগুলো শুধু আদালতের নথিতে জমে থাকা মামলার হিসাব নয়। প্রতিটি মামলার সঙ্গে যুক্ত থাকে অভিযোগকারী, সাক্ষী, অভিযুক্ত এবং কখনো কখনো একটি পরিবারের দীর্ঘ অনিশ্চয়তা।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী, অভিযোগ গঠনের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই সময়সীমা বহু ক্ষেত্রেই মানা যাচ্ছে না। ২০২৬ সালের অক্টোবরের প্রতিবেদনেও বিচারাধীন মামলার বিপুল জট এবং সময়সীমা তদারকির ঘাটতি উঠে এসেছে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে: বিচার দ্রুত শেষ করার আইনি নির্দেশনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী?
মামলার সংখ্যা বাড়লে শুধু বিচারকের সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা, সরকারি কৌঁসুলি, ফরেনসিক পরীক্ষাগার, চিকিৎসা প্রতিবেদন, সাক্ষী হাজির করার ব্যবস্থা এবং আদালতের প্রশাসনিক সক্ষমতা—সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি দিক উঠে এসেছে সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ গবেষণায়।
২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত গবেষণাটিতে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৩২ জেলার ৪৬টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি হওয়া ৪ হাজার ৪০টি মামলা পর্যালোচনা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, এসব মামলার মাত্র ৩ শতাংশে দণ্ডাদেশ হয়েছে, প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন এবং প্রায় ১৩ শতাংশ মামলা আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে। মামলাগুলো নিষ্পত্তি হতে গড়ে প্রায় ৩ বছর ৭ মাস সময় লেগেছে।
তবে এই সংখ্যাকে সরাসরি দেশের সব ধর্ষণ মামলার দণ্ডাদেশের হার বলা যাবে না। গবেষণাটি নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতাসংক্রান্ত একাধিক ধরনের মামলা নিয়ে করা হয়েছে। ফলে এর পরিসংখ্যানের পরিধি ও সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখেই ফলাফল ব্যাখ্যা করতে হবে।
তারপরও গবেষণাটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে: তদন্তে বিলম্ব, সাক্ষী ও অভিযোগকারীর অনুপস্থিতি, বারবার শুনানি পেছানো, দুর্বল প্রমাণ উপস্থাপন এবং সাক্ষী সুরক্ষার ঘাটতি।
একটি মামলা খালাসে শেষ হওয়া মানেই বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়। পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে নির্দোষ ব্যক্তিকে দণ্ডিত না করাও ন্যায়বিচারের অংশ। কিন্তু বিপুলসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তির পরও যদি দণ্ডাদেশের হার খুব কম থাকে, তাহলে তদন্ত ও প্রসিকিউশনের মান, মামলার ধরন এবং প্রমাণ সংগ্রহের কার্যকারিতা নিয়ে গভীর পর্যালোচনা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন পোস্টে প্রায়ই বলা হয়, ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধীরা গ্রেপ্তার হলেও শেষ পর্যন্ত কারও শাস্তি হয় না। বাস্তব চিত্রটি এত সরল নয়। কিছু মামলায় কঠোর সাজা হয়েছে, আবার কিছু মামলায় তদন্ত দীর্ঘদিন ধরে চলেছে।
সুবর্ণচর: ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলায় ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আদালত ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
অর্থাৎ, এই মামলায় বিচার হয়নি—এমন দাবি তথ্যসম্মত নয়। তবে রায় ঘোষণার পর আপিল, দণ্ড বহাল থাকা এবং সাজা কার্যকরের বর্তমান অবস্থা আলাদাভাবে যাচাই না করে মামলাটির চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত নয়।
এমসি কলেজ: ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজের ছাত্রাবাসে স্বামীর সামনে এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল একজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। অপর চার আসামি খালাস পান।
এই রায় দেখায়, দীর্ঘ সময় পর হলেও আলোচিত কোনো মামলায় আদালত দণ্ডাদেশ দিতে পারেন। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয়, গ্রেপ্তার থেকে বিচারিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে কতটা সময় লাগতে পারে এবং আদালতে প্রতিটি আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের গুরুত্ব কতখানি।
সোহাগী জাহান তনু: ২০১৬ সালে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় নিহত কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর মামলায় ২০২৬ সালের জুলাইয়েও নতুন করে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আদালত আরও দুজনের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার নির্দেশ দেন, যাতে তনুর পোশাক থেকে পাওয়া অজ্ঞাত পুরুষের ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে তুলনা করা যায়। ওই প্রতিবেদনের সময় তাঁদের কেউই পুলিশি হেফাজতে ছিলেন না।
ঘটনার এক দশক পরও তদন্তে নতুন নমুনা পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসা একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করে: প্রাথমিক পর্যায়েই যদি প্রয়োজনীয় ফরেনসিক প্রমাণ দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা যেত, তাহলে তদন্ত কি আরও আগে এগোতে পারত?
এই মামলার চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে অনুমান করার সুযোগ নেই। তবে এটি প্রমাণ করে, যৌন সহিংসতা ও হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে প্রমাণ সংগ্রহ এবং তদন্তের ধারাবাহিকতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯ ধারায় ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। সরকারি আইনভান্ডারে প্রকাশিত ধারাটির বর্তমান পাঠে ২০২৬ সালের সংশোধনের উল্লেখও রয়েছে।
তাহলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকা সত্ত্বেও যৌন সহিংসতা কেন বন্ধ হচ্ছে না?
প্রথমত, আইন কত কঠোর, তার পাশাপাশি অপরাধী কতটা নিশ্চিতভাবে শনাক্ত ও বিচারের মুখোমুখি হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধের পর তদন্ত দীর্ঘায়িত হলে, সাক্ষীকে ভয় দেখানোর সুযোগ থাকলে কিংবা মামলার প্রমাণ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা না গেলে কঠোর শাস্তির বিধান প্রত্যাশিত প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, অপরাধের পরপরই ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগ জানানোর কারণে যদি তাঁকে সামাজিক অপমান, হুমকি কিংবা পরিবারের চাপের মুখে পড়তে হয়, তাহলে ন্যায়বিচারের পথে বাধা তৈরি হয়।
তৃতীয়ত, বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা তৈরি হয় ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ প্রয়োগের মাধ্যমে। শুধু আলোচিত ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট নয়; অল্প আলোচিত বা প্রভাবহীন ভুক্তভোগীর মামলাতেও একই গুরুত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
অতএব, মৃত্যুদণ্ড থাকা সত্ত্বেও অপরাধ সংঘটিত হওয়া থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে শাস্তির কোনো ভূমিকা নেই। বরং প্রশ্ন হলো, আইনের বিধান, অপরাধ শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা এবং বিচার নিশ্চিত হওয়ার মধ্যে কতটা কার্যকর সংযোগ রয়েছে।
যৌন সহিংসতার অভিযোগের পর ভুক্তভোগীকে ঘিরে সামাজিক প্রতিক্রিয়াও বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। পোশাক, চলাফেরা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা ঘটনার সময় তাঁর আচরণ নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তোলা হলে অভিযোগকারীকে নতুন করে অপমানের মুখে পড়তে হয়।
আইনগত তদন্তে অভিযোগ যাচাই করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যেন ভুক্তভোগীকে দোষারোপ, অপমান বা ভয় দেখানোর উপায়ে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
এ জন্য প্রয়োজন ভুক্তভোগীবান্ধব চিকিৎসাসেবা, গোপনীয়তা রক্ষা, আইনি সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজন হলে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা। সাক্ষী ও অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের বয়স, মানসিক অবস্থা এবং নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালনা করা প্রয়োজন। অপরাধের বিচার করতে গিয়ে যেন শিশুকে বারবার সেই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে না হয়, সে জন্য সংবেদনশীল পদ্ধতি জরুরি।
বাংলাদেশে ধর্ষণ প্রতিরোধে এখন কয়েকটি ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
তদন্তের শুরুতেই প্রমাণ সংরক্ষণ: ঘটনাস্থলের আলামত, চিকিৎসা প্রতিবেদন, ডিএনএ নমুনা এবং ডিজিটাল প্রমাণ দ্রুত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ: কোন মামলা কেন দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে, তদন্তে কোথায় বিলম্ব হচ্ছে এবং শুনানি বারবার পিছিয়ে যাওয়ার কারণ কী—এসব বিষয়ে নিয়মিত তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা প্রয়োজন।
ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা বৃদ্ধি: বিচারক, প্রসিকিউটর, তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং সহায়ক কর্মীর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আইনে সময়সীমা নির্ধারণ করে দিলেই বিচার দ্রুত হয় না; সেই সময়সীমা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোও থাকতে হয়।
সাক্ষী সুরক্ষা ও আইনি সহায়তা: ভুক্তভোগী বা সাক্ষী যেন হুমকি, সামাজিক চাপ কিংবা আর্থিক সংকটের কারণে ন্যায়বিচারের পথ থেকে সরে যেতে বাধ্য না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রভাবমুক্ত তদন্ত ও বিচার: অভিযুক্তের রাজনৈতিক, আর্থিক বা সামাজিক পরিচয় যাই হোক, অভিযোগের তদন্ত ও বিচার যেন একই মানদণ্ডে পরিচালিত হয়।
অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক শিক্ষা: পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে সম্মতি, ব্যক্তিগত সীমানা, সমান মর্যাদা এবং যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল আচরণ সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। অপরাধ সংঘটনের পর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধের ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগও জরুরি।
ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। কেউ মৃত্যুদণ্ডকে আরও কঠোরভাবে কার্যকরের দাবি জানান, কেউ বিচারপ্রক্রিয়ার সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেন। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বিষয় উপেক্ষা করার সুযোগ নেই—আইনে কঠোর শাস্তি থাকা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক মামলা বছরের পর বছর বিচারাধীন থাকছে।
সুবর্ণচর ও এমসি কলেজের মামলায় কঠোর দণ্ডাদেশ হয়েছে; অন্যদিকে তনু হত্যার মতো ঘটনায় দীর্ঘ সময় পরও তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই দুই বাস্তবতা একসঙ্গে দেখায়, বিচারব্যবস্থাকে শুধু একটি মানদণ্ডে বিচার করা যায় না। কোথাও আদালতের রায় এসেছে, কোথাও তদন্ত এখনো শেষ হয়নি, আবার বহু মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
বাংলাদেশের সামনে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, অপরাধের অভিযোগ থেকে চূড়ান্ত বিচার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপকে কার্যকর, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করা। অপরাধের তদন্ত দ্রুত হতে হবে, কিন্তু তা যেন প্রমাণের মান ক্ষুণ্ন না করে। বিচার দ্রুত হতে হবে, কিন্তু তা যেন ন্যায়সংগত শুনানির অধিকার কেড়ে না নেয়। দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগেভাগে অপরাধী ঘোষণা করা যাবে না।
একটি সমাজে ন্যায়বিচারের শক্তি শুধু শাস্তির কঠোরতায় নয়, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগে প্রকাশ পায়। ভুক্তভোগী যেন ভয় ছাড়াই অভিযোগ জানাতে পারেন, সাক্ষী যেন নিরাপদে সত্য বলতে পারেন, আর অভিযুক্তের ক্ষমতা যেন বিচারকে প্রভাবিত করতে না পারে—এই নিশ্চয়তাই হওয়া উচিত বাংলাদেশের যৌন সহিংসতা প্রতিরোধের মূল ভিত্তি।
কারণ, ধর্ষণ প্রতিরোধের সাফল্য শুধু কতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো, তা দিয়ে মাপা যায় না; বরং কতটি অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হলো, কতটি মামলা ন্যায়সংগতভাবে নিষ্পত্তি হলো এবং কতজন মানুষ নিরাপদে বিচার পেলেন—সেই হিসাবেই বিচারব্যবস্থার প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ধারিত হবে।
(খোলা কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি২৪লাইভ ডট কম- এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
বাপ্পি/সা.এ


