Homeসর্বশেষচারপাশে অনেক মানুষ, তবু কেন একাকিত্বে ভোগেন অনেকে?

চারপাশে অনেক মানুষ, তবু কেন একাকিত্বে ভোগেন অনেকে?

Published on

spot_img

চারপাশে বন্ধু, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী—মানুষের অভাব নেই। প্রতিদিন কথা হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে যোগাযোগ। তবু দিন শেষে মনে হয়, মনের কথা খুলে বলার মতো কেউ নেই। মানুষের ভিড়ে থেকেও যেন একা। এই অদৃশ্য দূরত্বই ধীরে ধীরে জন্ম দেয় একাকিত্বের, বাড়িয়ে তোলে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ। কখনো তা বিষণ্নতার ঝুঁকিও বাড়ায়। বাইরে থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও ভেতরে ভেতরে এমন নিঃসঙ্গতার সঙ্গে লড়াই করছেন অনেকেই।

৩৬ বছর বয়সী শামসুর রহমান পলাশ (ছদ্মনাম) একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। এখনো বিয়ে করেননি। বাবা-মা ও ভাইবোনদের সঙ্গে থাকেন। স্কুলজীবনের ১০ থেকে ১২ জন বন্ধুর সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। তারপরও দিন শেষে নিজেকে একা মনে হয় তাঁর।

পলাশ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাবা-মা, ভাইবোনদের সঙ্গে থাকি। বন্ধুও অনেক আছে। কিন্তু আমাদের কথাবার্তা বেশির ভাগ সময় ওপর-ওপরই সীমাবদ্ধ থাকে। মনের ভেতরে জমে থাকা কথাগুলো কাউকে বলতে পারি না। বিষয়টি আমাকে খুব কষ্ট দেয়।’

কেন মনের কথা কাউকে বলতে পারেন না, তার পেছনে রয়েছে একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা। একসময় ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর সঙ্গে নিজের সব কথা ভাগাভাগি করতেন পলাশ। ব্যক্তিগত বিষয় থেকে শুরু করে মনের নানা দুশ্চিন্তা—সবই জানাতেন তাঁকে। কিন্তু একদিন সামান্য একটি বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে মনোমালিন্য হয়। এরপর ওই বন্ধু অন্যদের সামনে পলাশের ব্যক্তিগত কথাগুলো প্রকাশ করে দেন।

ঘটনাটি তাঁকে ভীষণ বিব্রত করে। সেই থেকে বন্ধুটির সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন পলাশ। তবে সেই অভিজ্ঞতার প্রভাব এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি।

তিনি বলেন, ‘ওই ঘটনার পর থেকে কাউকে আর বিশ্বাস করতে পারি না। অনেক সময় খুব চিন্তায় থাকি, ভয়ে থাকি। কাউকে বলতে পারলে হয়তো মনটা হালকা হতো, কারও পরামর্শে সমস্যার সমাধানও খুঁজে পেতাম। কিন্তু বিশ্বাস একবার ভেঙে যাওয়ার পর আর কাউকে মনের কথা বলতে পারি না। এতে মানসিক চাপ বাড়তে থাকে। কখনো কখনো কান্না পায়। এটা খুব অশান্তির অনুভূতি, যা কাউকে বোঝানোও কঠিন।’

পলাশের অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশলেও নিজের আবেগ, কষ্ট কিংবা দুশ্চিন্তা ভাগ করে নেওয়ার মতো কাউকে খুঁজে পান না। চারপাশে মানুষের উপস্থিতি থাকলেও তাঁদের ভেতরে তৈরি হয় নিঃসঙ্গতার অনুভূতি।

মানুষের পাশে থেকেও নিজের পাশে কাউকে পান না অনেকে

অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর অভ্যাস আছে হাবিবুর রহমানের। পরিচিত কেউ সমস্যায় পড়লে, এমনকি কখনো অপরিচিত মানুষের প্রয়োজনেও সাধ্যমতো সাহায্য করেন তিনি। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা, মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে অনেকেই ধরে নেন, যেকোনো পরিস্থিতিতে তাঁকে পাওয়া যাবে।

হাবিবুর বলেন, ‘আমি মানুষকে সাহায্য করতে চাই। কিন্তু নিজের সব কাজ ফেলে সব সময় সবার কাছে ছুটে যাওয়া সম্ভব নয়। কখনো কারও জন্য কিছু করতে না পারলে তাঁর আচরণ বদলে যায়। এতে আমার খারাপ লাগে, মানসিক কষ্টও হয়।’

তবে তাঁর হতাশার বড় কারণ, যাঁদের বিপদে তিনি পাশে দাঁড়িয়েছেন, নিজের কঠিন সময়ে তাঁদের অনেককেই পাশে পাননি।

তিনি বলেন, ‘আমি যখন খুব খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছি, তখন ওই মানুষগুলোকে পাশে পাইনি। তাদের আচরণ দেখে মনে হয়েছে, মানুষ নিজের স্বার্থ নিয়েই বেশি ভাবে। এসব কারণে প্রায়ই মনে হয়, আমি একা। আমার পাশে কেউ নেই।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, একাকিত্বের পেছনে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সামাজিক দক্ষতার ঘাটতি, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপনসহ নানা কারণ কাজ করতে পারে। কারও বিশ্বাসভঙ্গের অভিজ্ঞতা তাঁকে অন্যদের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, আবার কেউ কাজের ব্যস্ততায় ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেন সামাজিক যোগাযোগ। তবে একাকিত্বের কারণ বোঝার পাশাপাশি এর প্রভাব এবং তা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজে দেখাও জরুরি।

চারপাশে মানুষ থাকার পরও একাকিত্ব কেন?

মনোচিকিৎসক মেখলা সরকারের মতে, সামাজিক দক্ষতার ঘাটতি, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং সম্পর্কের তিক্ত অভিজ্ঞতা একাকিত্বের অন্যতম কারণ হতে পারে।

তিনি বলেন, অন্যের সঙ্গে মেশা, বন্ধুত্ব গড়ে তোলা ও সম্পর্ক ধরে রাখাও একধরনের দক্ষতা। এসব ক্ষেত্রে অস্বস্তি থাকলে কেউ কেউ ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা এড়িয়ে চলতে শুরু করেন।

প্রযুক্তির প্রভাবও কম নয়। মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের সরাসরি যোগাযোগের সময় কমিয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি, কোনো সম্পর্কে খারাপ অভিজ্ঞতা হলে অনেকে সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অন্যদেরও অবিশ্বাস করতে শুরু করেন। ফলে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলা কিংবা পুরোনো সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

মেখলা সরকারের মতে, একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি হলো বিশ্বাস, নিরাপত্তাবোধ ও পারস্পরিক নির্ভরতা। সংকটের সময়ে কাউকে পাশে না পাওয়া, ব্যক্তিগত কথার গোপনীয়তা রক্ষা না হওয়া কিংবা সম্পর্কে ব্যবহৃত হওয়ার অনুভূতি মানুষকে হতাশ করতে পারে। এসব অভিজ্ঞতা থেকেও একাকিত্ব তৈরি হয়।

দীর্ঘদিনের একাকিত্ব যেভাবে প্রভাব ফেলে মানসিক স্বাস্থ্যে

একাকিত্ব শুধু মন খারাপের অনুভূতি নয়; দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তা মানসিক সুস্থতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে মনের কথা ভাগ করে নেওয়ার মতো কেউ না থাকলে আবেগগত চাপ জমতে থাকে। কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করাও তখন আরও দুরূহ হয়ে উঠতে পারে।

মেখলা সরকারের ভাষ্য, দীর্ঘদিন সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকলে মানুষের আবেগগত চাহিদা অপূর্ণ থেকে যায়। জমে থাকা কষ্ট ও অনুভূতি ভাগ করে নিতে না পারলে বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে, কঠিন সময়ে বিশ্বাসযোগ্য কাউকে পাশে পেলে সংকট মোকাবিলা সহজ হয়।

তিনি আরও মনে করেন, ভালোবাসা, যত্ন ও সহযোগিতা মানুষের আত্মবিশ্বাস এবং আত্মমর্যাদাবোধ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। তাই মানসিক সুস্থতার জন্য অর্থপূর্ণ সামাজিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ।

ছবি: প্রতিকী ছবি

একাকিত্ব কাটিয়ে উঠতে কী করা যেতে পারে?

একাকিত্ব থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম ধাপ হলো এর কারণ চিহ্নিত করা। মেখলা সরকারের মতে, কারও সামাজিক উদ্বেগ, বিষণ্নতা কিংবা অন্য কোনো মানসিক সমস্যা আছে কি না, তা বিবেচনায় নিতে হবে। এসব সমস্যা থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া জরুরি।

অন্যদিকে, কাজের ব্যস্ততা কিংবা প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেলে সচেতনভাবে পরিবার, বন্ধু ও স্বজনদের জন্য সময় বের করতে হবে। কাজের পাশাপাশি সম্পর্কের যত্ন নেওয়াকেও দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তাঁর মতে, শারীরিক সুস্থতার জন্য যেমন খাবার ও ব্যায়ামের দিকে নজর দেওয়া হয়, তেমনি মানসিক ভালো থাকার জন্যও প্রয়োজন যত্নশীল সম্পর্ক, পারস্পরিক যোগাযোগ ও আবেগ ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ।

প্রযুক্তি বাড়লেও কমছে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টসের (বিএপি) যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. মো. তৈয়বুর রহমান মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার ঘটলেও মানুষের সঙ্গে মানুষের সরাসরি যোগাযোগ কমেছে।

তাঁর মতে, পারস্পরিক কথোপকথন, মতবিনিময় ও সহমর্মিতার মাধ্যমে অনেক মানসিক সংকট সহজে সামাল দেওয়া সম্ভব। মনের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা কিংবা কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর মতো ছোট উদ্যোগও একজন মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারে যে তিনি একা নন।

কেউ মন দিয়ে কথা শুনছে, কষ্টের সময়ে পাশে থাকছে—এই অনুভূতি মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে। পরিবার ও সমাজের সঙ্গে নিজের সংযোগ অনুভব করতে পারলে মানসিক চাপ সামলানোও সহজ হয়।

সবশেষে বলা যায়, একাকিত্ব দূর করতে শুধু মানুষের ভিড়ে থাকাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন সম্পর্ক, যেখানে মনের কথা বলা যায়, বিশ্বাস রাখা যায় এবং বিপদের সময়ে পাশে কাউকে পাওয়া যায়। সম্পর্কের সংখ্যা নয়, বরং তার গভীরতা ও আন্তরিকতাই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যস্ত জীবনে প্রিয়জনদের জন্য সময় রাখা, মন খুলে কথা বলা এবং পরস্পরের প্রতি যত্নশীল হওয়াই পারে নিঃসঙ্গতার দেয়াল কিছুটা হলেও ভেঙে দিতে।



বাপ্পি/সা.এ

Latest articles

১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ রুটের সব ফ্লাইট স্থগিত

সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আগামী ১৭ অক্টোবর...

৫ হাজার টাকার খাবার বিক্রি করে ফুডপান্ডা থেকে পেয়েছেন মাত্র ৬৭ টাকা!

ফুডপান্ডা, একটি বহুজাতিক ফুড ডেলিভারি প্রতিষ্ঠান৷ তাদের নিজস্ব এপস ব্যবহার করে ঘরে বসেই...

চোরাই আইফোন বিক্রির অভিযোগ ‘এপেল হট’র বিরুদ্ধে

রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কের ‘এপেল হট’ নামের একটি দোকান থেকে ব্যবহৃত আইফোন কিনে...

সাতক্ষীরায় অবৈধ সার কারখানায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা

সাতক্ষীরার কলারোয়ায় অবৈধভাবে সার উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণের অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ৫০...

More like this

১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ রুটের সব ফ্লাইট স্থগিত

সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আগামী ১৭ অক্টোবর...

৫ হাজার টাকার খাবার বিক্রি করে ফুডপান্ডা থেকে পেয়েছেন মাত্র ৬৭ টাকা!

ফুডপান্ডা, একটি বহুজাতিক ফুড ডেলিভারি প্রতিষ্ঠান৷ তাদের নিজস্ব এপস ব্যবহার করে ঘরে বসেই...

চোরাই আইফোন বিক্রির অভিযোগ ‘এপেল হট’র বিরুদ্ধে

রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কের ‘এপেল হট’ নামের একটি দোকান থেকে ব্যবহৃত আইফোন কিনে...