সোনাদিয়া খালের বুক চিরে স্পিডবোট এগোতেই দুই পাশে চোখে পড়ে সারি সারি বাইনগাছ। কিন্তু খানিক পরই সেই সবুজ দেয়াল ভেঙে যায়। কোথাও কেটে ফেলা গাছের গুঁড়ি, কোথাও মাটি তুলে বানানো বাঁধ। ছোট ছোট খালের মুখ আটকে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আর বনের ভেতর যত দূর চোখ যায়, সেখানে এখন চিংড়িঘের।
১৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে এমনই একটি বাঁধের ওপর বসে ছিল একটি পানকৌড়ি। আশপাশে তার চেনা আবাস নেই। পড়ে আছে কেবল কাটা গাছের গুঁড়ি আর ঘেরের পানি।
বহু বছর ধরে এভাবেই দখল ও চিংড়িচাষে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপের ম্যানগ্রোভ বন। এবার সেই দখলদারির বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্যারাবন কেটে গড়ে ওঠা অবৈধ চিংড়িঘের উচ্ছেদে নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করার প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো প্রস্তাবটি গত ৩ আগস্ট অনুমোদন করা হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সোনাদিয়ার প্যারাবন থেকে অবৈধ চিংড়িঘের উচ্ছেদে নৌবাহিনীর সহায়তায় বড় পরিসরে অভিযান চালানো হবে। এ জন্য এ মাসেই সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, নৌবাহিনী ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে উচ্ছেদের কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা খানম বলেন, প্রধানমন্ত্রী নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করে সোনাদিয়া দ্বীপের অবৈধ দখল উচ্ছেদে সম্মতি দিয়েছেন। নৌবাহিনীও সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
তিনি বলেন, ‘সোনাদিয়াকে দখলমুক্ত করে এর জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নেওয়া হবে।’
ম্যানগ্রোভ বনের প্রাণ জোয়ার-ভাটা। অসংখ্য ছোট খাল দিয়ে সমুদ্রের পানি বনের ভেতরে ঢোকে এবং আবার বেরিয়ে যায়। এই স্বাভাবিক পানিপ্রবাহই ম্যানগ্রোভের মাটি, উদ্ভিদ ও প্রাণবৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখে।
কিন্তু সোনাদিয়ায় সেই স্বাভাবিক প্রবাহের পথেই বসানো হয়েছে বাঁধ। খালের মুখ আটকে দিয়ে বনের জায়গা ঘিরে তৈরি করা হয়েছে চিংড়িঘের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন জোয়ার-ভাটা বন্ধ থাকলে ম্যানগ্রোভের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ে। একসময় গাছ শুকিয়ে যায়, মাটির গুণাগুণ বদলে যায় এবং ধীরে ধীরে প্রাণবৈচিত্র্য হারাতে থাকে পুরো এলাকা। সোনাদিয়ায় এখন সেই প্রক্রিয়ারই ভয়াবহ চিত্র দেখা যাচ্ছে।
১৬ সেপ্টেম্বর দ্বীপের প্যারাবনের পূর্ব অংশে গিয়ে দেখা যায়, সোনাদিয়া খালের দুই পাশের বনের ভেতর অসংখ্য ছোট খাল ঢুকে গেছে। কিন্তু অনেক খালের মুখ মাটি ও বাঁধ দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কাটা হয়েছে বড় বড় বাইনগাছ। কোথাও গাছের গুঁড়ি পড়ে আছে ঘেরের পানির ধারে।
বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, দখলদারির কারণে সোনাদিয়ায় কমপক্ষে ৭ হাজার একর প্যারাবন কেটে ফেলা হয়েছে।
পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় ২০০৬ সালে সোনাদিয়া দ্বীপকে প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ ঘোষণা করে সরকার। ইসিএ ঘোষিত এলাকায় পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ। এরপরও দ্বীপের প্যারাবন রক্ষা পায়নি।
২০১৭ সালে ইকোট্যুরিজম পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মাত্র ১ হাজার ১ টাকার বিনিময়ে সোনাদিয়ার ৯ হাজার ৪৬৬ দশমিক ৯৩ একর বনভূমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
কিন্তু বেজা জায়গাটি বুঝে নেওয়ার পর সেখানে ইকোট্যুরিজম পার্কের কার্যক্রম আর এগোয়নি। অন্যদিকে বন বিভাগের আইনি কর্তৃত্বও কমে যায়। এর সুযোগে প্যারাবন দখলের প্রবণতা আরও বেড়ে যায় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।
২০২৫ সালের মার্চে সরকার সোনাদিয়ার ৯ হাজার ৪৬৬ একর বনভূমি আবার বন বিভাগের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ পর্যন্ত দ্বীপের তিনটি মৌজার প্রায় ৮ হাজার ৪৫ একর বনভূমি বন বিভাগের কাছে ফেরত এসেছে।
তবে বেজার হাতে এখনো দ্বীপের ছয়টি মৌজায় ১২ হাজার ২৭০ একর বনভূমি রয়েছে।
সোনাদিয়ার প্যারাবন রক্ষার দায়িত্বে থাকা বন বিভাগের মাঠকর্মীদের অবস্থাও নাজুক।
কুতুবজুম ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ড সোনাদিয়া। সেখানে বন বিভাগের একটি মাঠপর্যায়ের কার্যালয় রয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর ওই কার্যালয়ে কথা হয় বিট কর্মকর্তা আলাউদ্দিন আল আজাদের সঙ্গে।
তিনি বলেন, প্যারাবন দখলে বাধা দিতে গেলে বনকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘গত বছর রোজার সময় এ রকম একটি হামলায় আমাদের কয়েকজন সহকর্মী আহত হয়েছিলেন। এ বিট অফিসে আমরা মাত্র ছয়জন কর্মরত। অথচ শত শত মানুষ দলবদ্ধ হয়ে প্যারাবন দখল করতে আসে। তাদের প্রতিহত করার মতো জনবল আমাদের নেই।’
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের এমন বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, শুধু প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে সোনাদিয়ার দখলদারদের সরানো কতটা কঠিন।
দ্বীপটিতে অবৈধ দখলের ব্যাপ্তি কতটা, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় মহেশখালী উপজেলা প্রশাসনের জরিপে।
২০২৫ সালের ওই জরিপে সোনাদিয়ায় প্রায় ৪৫ কিলোমিটার বাঁধের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এসব বাঁধ উচ্ছেদ করতে উপজেলা প্রশাসন সরকারের কাছে ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়েছিল।
একই বছর উপজেলা প্রশাসন ১১টি অবৈধ চিংড়িঘের উচ্ছেদও করে।
কিন্তু স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে সোনাদিয়ার প্যারাবন রক্ষা করা সম্ভব নয়। কারণ, একটি ঘের উচ্ছেদের পর নজরদারি না থাকলে কিছুদিনের মধ্যেই সেখানে আবার দখল শুরু হয়।
সোনাদিয়ার অবৈধ চিংড়িঘের উচ্ছেদে নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ‘স্ট্রেনদেনিং ক্যাপাসিটি অব এমওইএফসিসি, ডিওই অ্যান্ড বিএফডি ফর ন্যাচারাল রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইমপ্রুভড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স’ প্রকল্পের আওতায়।
প্রকল্পটির পরিচালক ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ফাহমিদা হক খান বলেন, সশস্ত্র বাহিনীকে কোনো উদ্যোগে সম্পৃক্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। সেই অনুমোদন আগস্টে পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, এ মাসে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, নৌবাহিনী ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একটি সভা হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে উচ্ছেদ অভিযানের কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা হবে।
ফাহমিদা হক খান বলেন, ‘এ অভিযানে নৌবাহিনীর প্রায় চার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। তবে প্রকল্পে উচ্ছেদের জন্য আমাদের বরাদ্দ আছে দুই কোটি টাকা। সভায় এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে আসতে পারব বলে আশা করছি।’
পরিবেশকর্মীদের কাছে নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত আশাব্যঞ্জক হলেও তাদের মূল উদ্বেগ উচ্ছেদ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, সোনাদিয়ায় এর আগেও লোকদেখানো উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে। এবার নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করে বড় ধরনের অভিযান হলে সেটি ইতিবাচক।
তিনি আরও বলেন, ‘তবে শুধু উচ্ছেদ করলেই হবে না। উচ্ছেদের পর পুরো দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কী পদক্ষেপ নেয়, সেটাও দেখতে হবে।’
আলমগীর কবিরের মতে, পুনরায় যাতে সেখানে অবৈধ চিংড়িঘের গড়ে উঠতে না পারে, সে জন্য শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি প্রয়োজন।
একই দাবি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের মহেশখালী উপজেলার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আমিনুল হকের। তার ভাষ্য, দখলদার উচ্ছেদের পাশাপাশি সোনাদিয়া রক্ষায় বন বিভাগের জনবল বাড়াতে হবে।
কারণ সোনাদিয়ার লড়াই শুধু কয়েকটি চিংড়িঘের উচ্ছেদের লড়াই নয়। এটি জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার লড়াই, ম্যানগ্রোভের হাজারো গাছকে বাঁচানোর লড়াই, আর দ্বীপটির হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের লড়াই।
নৌবাহিনী নামবে, উচ্ছেদ হবে বাঁধ ও চিংড়িঘের। কিন্তু এরপর যদি আবারও দখলদাররা ফিরে আসে, তাহলে সোনাদিয়ার প্যারাবনের জন্য এই অভিযানও শেষ পর্যন্ত আরেকটি ক্ষণস্থায়ী দৃশ্য হয়েই থেকে যেতে পারে।
বাপ্পি/সা.এ


