একসময় ‘বাংলার শস্যভাণ্ডার’ ও খাল-নদীর সৌন্দর্যের কারণে ‘বাংলার ভেনিস’ নামে পরিচিত ছিল বরিশাল। দূর-দূরান্ত থেকে আসা বণিকদের আনাগোনায় মুখর থাকত এ অঞ্চলের বন্দরগুলো। তবে সময়ের সঙ্গে সেই ঐতিহ্য অনেকটাই হারিয়েছে। কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে সংকট, শিল্পায়নের ঘাটতি এবং কর্মসংস্থানের অভাবে দেশের আট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র বিভাগে পরিণত হয়েছে বরিশাল।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দারিদ্র্য মানচিত্র ২০২২ অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ২ শতাংশ। সেখানে বরিশাল বিভাগে এ হার ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ—যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। একসময় দরিদ্রতম বিভাগ হিসেবে পরিচিত রংপুর এখন ২৫ শতাংশ দারিদ্র্যের হার নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
কর্মসংস্থানের সংকটের কারণে বরিশালের অনেক মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছেন। জনশুমারি ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, বরিশালের স্থানীয় অধিবাসীদের ১৮ দশমিক ৬২ শতাংশ বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করেন। তাদের একটি বড় অংশ রাজধানীর বিভিন্ন বস্তিতে বসবাস করছেন।
কৃষিতে বাড়ছে সংকট
বরিশালের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর হলেও সাম্প্রতিক সময়ে কৃষি উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বরিশালে আউশ ধানের উৎপাদন আগের বছরের ৪ লাখ ৩০ হাজার টন থেকে কমে ৩ লাখ ৭৪ হাজার টনে নেমেছে। একইভাবে কমেছে আমন উৎপাদনও।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক এ এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জমিতে লবণাক্ততা বাড়ছে। এতে ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
শুধু কৃষি নয়, মৎস্য খাতেও দেখা দিয়েছে সংকট। বিভাগীয় মৎস্য অফিসের হিসাবে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরিশালে ৩ লাখ ৭২ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ২ লাখ ৬৬ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন কমেছে প্রায় ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
এর প্রভাব পড়েছে কৃষকের আয়েও। বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, ধান ও গম উৎপাদনে বরিশালের কৃষকদের বার্ষিক নিট আয় মাত্র ৬ হাজার ৮১ টাকা, যা দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন।
গ্যাস থাকলেও শিল্পায়ন হয়নি
বরিশাল বিভাগের আরেক সম্ভাবনা জ্বালানি সম্পদ। ভোলায় বাপেক্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের বড় মজুদ রয়েছে। তবে দীর্ঘ তিন দশকেও এ গ্যাসকে কাজে লাগিয়ে উল্লেখযোগ্য শিল্পায়ন গড়ে ওঠেনি।
ছয় জেলার পুরো বিভাগে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য শিল্পকারখানার সংখ্যা কম। শুধু বরিশাল জেলাতেই প্রায় ৪০৯টি কারখানা রয়েছে, যেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিকের।
যোগাযোগ ও পরিকল্পনার ঘাটতি
দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে নদীনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থাকে দায়ী করেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক। তার মতে, দক্ষিণাঞ্চলের প্রভাবশালী নেতারা জাতীয় রাজনীতিতে বেশি মনোযোগী থাকায় পুরো অঞ্চলের সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বরিশাল-১ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, জ্বালানি সংকট ও দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে উপকূলীয় এ অঞ্চল পিছিয়ে পড়েছে।
তবে ভোলার গ্যাস স্থানীয় শিল্প ও সার কারখানায় ব্যবহার, পায়রা বন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু এবং ভোলা-বরিশাল সংযোগ মহাসড়ক নির্মাণ করা গেলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
দারিদ্র্যের হারে বরিশাল সবার ওপরে
বিবিএসের দারিদ্র্য মানচিত্র ২০২২ অনুযায়ী, ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ দারিদ্র্যের হার নিয়ে দেশের আট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে বরিশাল। বিপরীতে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ দারিদ্র্যের হার নিয়ে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ।
বিভাগভিত্তিক দারিদ্র্যের হার হলো—রংপুর ২৫ শতাংশ, ময়মনসিংহ ২২ দশমিক ৬ শতাংশ, ঢাকা ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ, সিলেট ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ, খুলনা ১৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং রাজশাহী ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
কুশল/সাএ


