রাজধানীর এক অভিজাত ফ্ল্যাটের ঝকঝকে চার দেয়ালের আড়ালে চলত পৈশাচিক নির্যাতন। সেই ভয়াল রূপ এখন ভেসে উঠেছে খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের এক চিলতে ঠান্ডা মেঝেতে। অবুঝ শিশু তানিয়া আক্তারের (১১) শরীরজুড়ে এখন অমানবিক ক্ষত, পোড়াদাগ আর পচন। কোনো জটিল রোগে নয়, বরং মানুষের নির্মম নির্যাতনে মৃত্যুর সাথে লড়ছে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার করল্যাছড়ি গ্রামের এই শিশু।
পাঁচ বছর আগে তানিয়ার মা মারা যাওয়ার পর দিনমজুর পিতা বেলাল হোসেনের সংসারে নেমে আসে চরম অর্থনৈতিক অন্ধকার। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া তানিয়া ও তার অপর বোনকে নিয়ে অভাবের সাথে লড়াই করছিলেন বেলাল। ঠিক সেই সময় প্রতিবেশী তোফাজ্জল হোসেনের আশ্বাসে ভালো ভবিষ্যতের আশায় তানিয়াকে ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজে পাঠাতে রাজি হন বাবা। কিন্তু কোন ঠিকানায় তাকে নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে নিঃস্ব বাবার কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না।
জানা যায়, প্রথমে ফেনী শহরের ট্রাংক রোড এলাকায় এবং পরবর্তীতে ঢাকার মিরপুরের পূর্ব শেওড়াপাড়ায় কাফরুল থানা এলাকায় ল্যাগেজ ব্যবসায়ী রাসেল ও তাঁর স্ত্রী স্কুলশিক্ষিকা মোর্শেদা আকতার ওরফে ছোটনের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয় তানিয়াকে। সেখানে শুরু হয় তার জীবনের অন্ধকারতম অধ্যায়।
তানিয়ার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ দেড় বছর ধরে তার দিন কেটেছে চরম আতঙ্ক ও নিরবচ্ছিন্ন অমানবিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে। শিশু তানিয়া আকুতি জানিয়ে বলে, ‘দেড় বছর ধরে বাবার সাথে আমাকে কোনো যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি। প্রতিদিনের ন্যূনতম খাবার থেকেও বঞ্চিত রেখে দিনের বড় একটি সময় অন্ধকার টয়লেটে বন্দি রাখা হতো। সামান্য ভুল হলেই রান্নাঘরের উত্তপ্ত খুন্তি বা গরম ধাতব পদার্থ দিয়ে শরীরে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো। ক্রমাগত শারীরিক আঘাতে মাথা ফেটে যাওয়ার পর চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় সেলাই ও পোড়া ক্ষতে শেষ পর্যন্ত পচন ধরে দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করেছে।’
তানিয়ার বাবা মো. বেলাল বলেন, ‘আমার অভাবের সংসার ছিল। স্বচ্ছলতার আশায় প্রতিবেশীর কথামতো মেয়েকে কাজের জন্য পাঠাই। কিন্তু গৃহকর্তা রাসেল ও তাঁর স্ত্রী স্কুলশিক্ষিকা মোর্শেদা আকতার ওরফে ছোটন দেড় বছর ধরে আমার মেয়ের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে তার জীবনটা শেষ করে দিয়েছে।’ কেউ যেন তাঁর মতো ভুল করে নিজের সন্তানকে অন্যের বাসায় কাজে না পাঠায়- অশ্রুসিক্ত চোখে সেই অনুরোধও জানান তিনি।
নির্যাতনের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে তানিয়া মৃত্যুর মুখোমুখি হলে অপরাধ ধামাচাপা দিতে অভিযুক্তরা তাকে ঢাকা থেকে এনে ফেনী সদর হাসপাতালে রেখে উধাও হয়ে যায়। খবর পেয়ে বাবা বেলাল হোসেন সেখান থেকে গত শুক্রবার রাতে অসুস্থ কন্যাকে খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে হাসপাতালে সরকারি শয্যা না পেয়ে বারান্দার মেঝেতেই যন্ত্রণায় ছটফট করছে শিশুটি।
খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রিপল বাপ্পী চাকমা জানান, ‘শিশুটির শরীরে দীর্ঘদিন ধরে চালানো নির্যাতনের স্পষ্ট আলামত রয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা চরম আশঙ্কাজনক হওয়ায় দ্রুত বিশেষায়িত উন্নত চিকিৎসা জরুরি।’
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট সৃজনি ত্রিপুরা বলেন, ‘ভিকটিমের পক্ষে থানায় গিয়ে যেকোনো ব্যক্তি এজাহার দায়ের করতে পারেন। মামলা গ্রহণ করে পুলিশ অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে। তাছাড়া বাংলাদেশের আইনানুসারে রাষ্ট্র শিশুটির সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তার সাথে ঘটে যাওয়া অপরাধের বিচার করতে বাধ্য।’
খাগড়াছড়ি সদর থানার ওসি তদন্ত মো. মিসবাহ উদ্দিন বলেন, ‘অপরাধটি ঢাকার যে থানা এলাকায় সংঘটিত হয়েছে সেখানে মামলা দায়ের করতে হবে। ঢাকার ঘটনায় খাগড়াছড়িতে স্থানীয়ভাবে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সীমত।’
বাপ্পি/সা.এ


