Homeসর্বশেষঅভাবের সংসার থেকে উঠে এসে জেলায় সর্বোচ্চ নম্বর পেলেন পূজা, স্বপ্ন ডাক্তার...

অভাবের সংসার থেকে উঠে এসে জেলায় সর্বোচ্চ নম্বর পেলেন পূজা, স্বপ্ন ডাক্তার হওয়ার

Published on

spot_img

বিদ্যুৎ চলে গেলে কখনো চার্জলাইটের আলো, কখনো কেরোসিনের বাতি জ্বেলে বই নিয়ে বসত সে। অভাবের সংসারে অনেক কিছুরই ছিল সীমাবদ্ধতা, কিন্তু সীমাবদ্ধতা ছিল না তার স্বপ্নে। সেই স্বপ্ন আর কঠোর পরিশ্রমের ফলও মিলেছে অসাধারণভাবে। ১ হাজার ২৫০ নম্বরের মধ্যে ১ হাজার ২১০ নম্বর পেয়ে নড়াইল জেলায় সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করেছে পূজা বিশ্বাস। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় নড়াইল সদর উপজেলার কৃষ্ণলতা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬ বছর বয়সী পূজা বিশ্বাস। কৃষক পরিবারের এই মেয়ের স্বপ্ন বড় হয়ে ডাক্তার হওয়া। ডাক্তার হয়ে গ্রামের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সেবা করতে চায় সে।

নড়াইল সদর উপজেলার কলোড়া ইউনিয়নের নলদিচর গ্রামে পূজাদের বাড়ি। তার বাবা নৃত্য গোপাল বিশ্বাস পেশায় একজন কৃষক, মা দীপ্তি রানী বিশ্বাস গৃহিণী। পাঁচ শতাংশ জমির ওপর ছোট্ট বসতভিটাই পরিবারের একমাত্র সম্বল। তিন ভাই-বোনসহ সাত সদস্যের সংসার। কৃষিকাজ করে সংসার চালাতে গিয়ে বছরের অধিকাংশ সময়ই অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করতে হয় পরিবারটিকে। এমন বাস্তবতার মধ্যেও পড়াশোনা থামিয়ে দেয়নি পূজা। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি ছিল তার গভীর আগ্রহ। বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতির পাশাপাশি বাড়িতে সুযোগ পেলেই বই নিয়ে বসত। বিদ্যুৎ না থাকলেও থেমে থাকেনি তার পড়াশোনা।

পূজা বলে, “আমি বড় হয়ে ডাক্তার হতে চাই। চিকিৎসক হয়ে গরিব মানুষের সেবা করতে চাই। বিশেষ করে যারা অর্থের অভাবে সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারেন না, তাদের জন্য কাজ করতে চাই। কিন্তু বাবা-মা আমাকে মেডিকেলে পড়াতে পারবেন কি না, জানি না। তাদের পক্ষে এত খরচ বহন করা কঠিন। তবু চেষ্টা চালিয়ে যেতে চাই।”

তিন ভাই-বোনের মধ্যে পূজা বড়। ছোটবেলা থেকেই মেয়ের পড়াশোনার আগ্রহ দেখে বাবা-মাও তাকে উৎসাহ দিয়ে গেছেন। নিজেদের সামর্থ্য সীমিত হলেও মেয়ের পড়াশোনায় কখনো বাধা দেননি। মেয়ের এমন সাফল্যে গর্বিত হলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না পূজার বাবার। কৃষিকাজ করে কোনোমতে সাত সদস্যের সংসার চালাতে হয় তাকে। তাই মেয়ের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজনীয় খরচ কীভাবে জোগাড় করবেন, সেই চিন্তাই এখন তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।

পূজার বাবা নৃত্য গোপাল বিশ্বাস বলেন, “আমার মেয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। এতে আমরা অনেক খুশি। কিন্তু আমি একজন কৃষক। অনেক কষ্ট করে সংসার চালাই। মেয়েটার পড়াশোনার ইচ্ছে খুব বেশি। যতটুকু পেরেছি তাকে পড়িয়েছি। মেয়েটার মেডিকেল পড়ার ইচ্ছে। আমি তার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। কিন্তু মেডিকেল পড়ানোর খরচ মেটানো আমার পক্ষে কঠিন। সমাজের বিত্তবান মানুষ বা কোনো প্রতিষ্ঠান যদি পাশে দাঁড়ায়, তাহলে আমার মেয়ের স্বপ্ন পূরণ হতে পারে।”

পূজার মা দীপ্তি রানী বলেন, ‘মেয়েটার স্বপ্ন ডাক্তার হবে। আমরাও চাই তার স্বপ্ন পূরণ হোক। আমরা গরিব মানুষ, কতদূর কী করতে পারব জানি না। তবে যতদূর পড়তে চায় ততদূর পড়ানোর চেষ্টা করব।’

তার মা আরও বলেন, ‘অভাবের সংসার হলেও মেয়েকে কখনো পড়াশোনা ছাড়তে বলিনি। ও অনেক কষ্ট করে পাস করেছে। এখন শুধু চাই, ও যেন লেখাপড়া চালিয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।’

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই প্রতিটি শ্রেণিতে ভালো ফল করে আসছিল পূজা। নিয়মিত উপস্থিতি, পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ এবং শিক্ষকদের পরামর্শ মেনে চলার কারণে শুরু থেকেই তাকে নিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রত্যাশা ছিল।

কৃষ্ণলতা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমীর গোলদার বলেন, “ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির পর থেকে তার মেধার প্রকাশ ফুটে উঠেছিল। সে জেলার সর্বোচ্চ নম্বরধারী শিক্ষার্থী। সে ১২৫০ নম্বরের মধ্যে ১২১০ পেয়েছে। এটা জেলার সর্বোচ্চ নম্বর, যা পূজা অর্জন করেছে। আমাদের স্কুলটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত। এখানে অনেকে ভর্তি হয় না। পূজা মেয়েটি গরিব পরিবারের মেয়ে, তার মেধা দেখে আমাদের তাকে নিয়ে স্বপ্ন ছিল। তার চেষ্টা ও শিক্ষকদের আন্তরিকতার কারণে আজ সে জেলার সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে।”

কৃষ্ণলতা মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি বিদ্যুৎ কুমার স্যানাল বলেন, “প্রত্যন্ত গ্রামের একটি বিদ্যালয় থেকেও কঠোর পরিশ্রম, মেধা, অধ্যবসায় ও সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে এই ফলাফল অর্জন করা সম্ভব। পূজা বিশ্বাসের এই অসাধারণ সাফল্য তারই উজ্জ্বল প্রমাণ। একই সঙ্গে আমি আহ্বান রাখি, পূজা বিশ্বাসের সাফল্যকে অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করে বিদ্যালয়ের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ছাত্রীরা আরও বড় সাফল্য বয়ে আনবে।”

এবার নড়াইল জেলা থেকে ৮ হাজার ২৬২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে মোট ৪০৪ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ৩৭০ জন, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ১৬ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ১৮ জন জিপিএ-৫ অর্জন করেছে।



সালাউদ্দিন/সাএ

Latest articles

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট না দেওয়ার কারণ জানালেন রুমিন ফারহানা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেননি।...

নালিতাবাড়ীতে কৃষক কৃষাণীর মাঝে ফল গাছের চারা বিতরণ

শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে কৃষক কৃষাণীর মাঝে জাতীয় ফল কাঁঠাল গাছের চারা বিতরণ করা হয়েছে। শুক্রবার...

শাহজাদপুর কেন্দ্রীয় মহাশ্মশান পরিচালনা ও উন্নয়ন কমিটি গঠন

শাহজাদপুর কেন্দ্রীয় মহাশ্মশান পরিচালনা ও উন্নয়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। শুক্রবার বেলা ১১টায়...

মন্ত্রিসভায় যুক্ত হচ্ছেন নতুন চার মুখ, রাতে শপথ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় নতুন করে আরও চারজন সদস্য যুক্ত হচ্ছেন। শুক্রবার...

More like this

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট না দেওয়ার কারণ জানালেন রুমিন ফারহানা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেননি।...

নালিতাবাড়ীতে কৃষক কৃষাণীর মাঝে ফল গাছের চারা বিতরণ

শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে কৃষক কৃষাণীর মাঝে জাতীয় ফল কাঁঠাল গাছের চারা বিতরণ করা হয়েছে। শুক্রবার...

শাহজাদপুর কেন্দ্রীয় মহাশ্মশান পরিচালনা ও উন্নয়ন কমিটি গঠন

শাহজাদপুর কেন্দ্রীয় মহাশ্মশান পরিচালনা ও উন্নয়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। শুক্রবার বেলা ১১টায়...