সন্তানকে সব ধরনের বিপদ ও ব্যর্থতা থেকে আগলে রাখতে চান বাবা-মা। কিন্তু অতিরিক্ত সুরক্ষা দিতে গিয়ে অজান্তেই কি তার শেখার সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছেন? মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ভুল করার সুযোগ পাওয়া এবং সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া শিশুর মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সন্তানের ভালো চান সব অভিভাবকই। তাই ছোটবেলা থেকেই তাঁরা চেষ্টা করেন, সন্তান যেন কোনও সমস্যায় না পড়ে, ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে কষ্ট না পায় কিংবা ব্যর্থতার মুখোমুখি না হয়। কিন্তু প্রতিটি ভুল শুধরে দেওয়া বা সব সমস্যার সমাধান করে দেওয়াই শিশুর জন্য সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি নয়।
শিশুরা প্রতিদিন নতুন কিছু শেখে। কখনও খেলায় হেরে যায়, কখনও নিজের কাজ ঠিকমতো করতে পারে না, আবার কখনও ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে সমস্যায় পড়ে। এসব অভিজ্ঞতা থেকেই তারা ধীরে ধীরে সমস্যা সমাধান, দায়িত্ব নেওয়া এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখে।
শিশু কোনও কাজে ভুল করলেই বকাঝকা করা কিংবা প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করার ফলে তার মধ্যে ব্যর্থতার ভয় তৈরি হতে পারে। নতুন কিছু চেষ্টা করার ক্ষেত্রে দ্বিধা বাড়তে পারে, কমে যেতে পারে নিজের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাসও।
অন্যদিকে, নিরাপদ পরিবেশে নিজের ভুল বুঝতে এবং তা সংশোধনের সুযোগ পেলে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়তে পারে। যেমন, স্কুলের ব্যাগ গোছাতে গিয়ে কোনও বই নিতে ভুলে গেলে পরেরবার তালিকা তৈরি করে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠতে পারে। এভাবেই ছোট ছোট অভিজ্ঞতা শিশুকে আরও দায়িত্বশীল হতে সাহায্য করে।
কীভাবে সন্তানকে ভুল থেকে শিখতে সাহায্য করবেন?
নিজে চেষ্টা করার সুযোগ দিন: বয়স অনুযায়ী স্কুলের ব্যাগ গোছানো, খেলনা গুছিয়ে রাখা কিংবা ছোটখাটো সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দিন। কাজটি নিখুঁত না হলেও সঙ্গে সঙ্গে শুধরে না দিয়ে তাকে আবার চেষ্টা করতে উৎসাহিত করুন।
বকাঝকা না করে আলোচনা করুন: ভুল করলে রেগে না গিয়ে জানতে চান, কী ঘটেছে এবং কেন ঘটেছে। পরেরবার কীভাবে আরও ভালো করা যায়, তা নিয়ে সন্তানের সঙ্গে কথা বলুন।
সব সমস্যার সমাধান করে দেবেন না: বন্ধুর সঙ্গে মনোমালিন্য বা খেলায় হেরে গেলে সন্তানের কথা শুনুন। কীভাবে পরিস্থিতি সামলানো যায়, তা নিজে ভাবতে সাহায্য করুন। তবে বুলিং, নির্যাতন কিংবা বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে অভিভাবকের সক্রিয় হস্তক্ষেপ জরুরি।
চেষ্টার প্রশংসা করুন: শুধু সাফল্যের জন্য নয়, কঠিন কাজ করার চেষ্টা, ভুল বুঝতে পারা এবং ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করার জন্যও সন্তানের প্রশংসা করুন। এতে নতুন কিছু শেখার আগ্রহ বাড়তে পারে।
ভুলের পরিণতি বুঝতে দিন: কোনও কাজ অসম্পূর্ণ রাখলে কীভাবে তা শেষ করা যায়, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিন। নিরাপদ ও বয়সোপযোগী উপায়ে নিজের কাজের দায়িত্ব নিতে শেখান। তবে ভুলের জন্য অপমান করা বা ভয় দেখানো উচিত নয়।
শিশুর বয়স, মানসিক পরিপক্বতা এবং পরিস্থিতি বিবেচনা করেই তাকে স্বাধীনতা দিতে হবে। খেলনা গুছিয়ে রাখা বা নিজের বই বেছে নেওয়ার মতো কাজে স্বাধীনভাবে চেষ্টা করার সুযোগ দেওয়া যায়। কিন্তু রাস্তা পার হওয়া, আগুন ব্যবহার করা কিংবা বিপজ্জনক যন্ত্রপাতি ধরার মতো ক্ষেত্রে অভিভাবকের সরাসরি তত্ত্বাবধান প্রয়োজন।
সন্তান ভুল করে হতাশ হলে প্রথমে তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলে ভুল থেকে কী শেখা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করুন। এতে সে বুঝতে পারবে, ভুল করা মানেই ব্যর্থ হওয়া নয়; বরং ভুল সংশোধন করে সামনে এগিয়ে যাওয়াও শেখার অংশ।
সন্তানকে ভুল করতে দেওয়ার অর্থ অবহেলা করা নয়। বরং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও দিকনির্দেশনা নিশ্চিত করে তাকে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সুযোগ দেওয়া।
বাবা-মায়ের দায়িত্ব প্রতিটি বাধা সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং সন্তানকে বাধা মোকাবিলার দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করা। ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলে শিশু ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল এবং সমস্যা সমাধানে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
মনে রাখবেন, সন্তানের প্রতিটি ভুল শুধরে দেওয়ার চেয়ে কখনও কখনও তাকে নিজে ভুলটি বুঝতে সাহায্য করাই বেশি কার্যকর।
বাপ্পি/সা.এ


