অ্যাকশন কিংবা হরর ছাড়াও সিনেমা দর্শককে দিতে পারে তীব্র উত্তেজনা। তার বড় প্রমাণ সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার বা মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার। এই ঘরানার সিনেমার মূল আকর্ষণ মানুষের মনের জটিলতা, ভয়, অপরাধবোধ, সন্দেহ ও পরিচয়ের সংকটকে ঘিরে তৈরি গল্প।
এসব সিনেমা দর্শককে এমন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়, যেখানে বারবার মনে হয়—আসলে কাকে বিশ্বাস করা যায়? বিপদ কি সত্যিই বাইরে, নাকি সবকিছুই ঘটছে চরিত্রটির মনের ভেতর? দুর্দান্ত অভিনয়, টানটান গল্প আর মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া টুইস্টের কারণে কিছু সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার শেষ হওয়ার পরও অনেক দিন মনে থেকে যায়। তেমনই ১০টি সিনেমা নিয়ে এই তালিকা।
১. গন গার্ল: বিয়ে, মিডিয়া ও বিষাক্ত সম্পর্কের ফাঁদ
পঞ্চম বিবাহবার্ষিকীর দিন হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায় অ্যামি। সন্দেহের তীর দ্রুতই গিয়ে পড়ে তার স্বামী নিকের দিকে। এরপর মিডিয়া পুরো ঘটনাকে এক ধরনের রিয়্যালিটি শোতে পরিণত করে। নিকের প্রতিটি আচরণ, এমনকি তার হাসিও এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন সে-ই খুনি।
কিন্তু গল্প যত এগোয়, ততই বদলে যেতে থাকে ছবির চেহারা। এটি নিছক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নয়; বরং প্রতিশোধ, মিথ্যা এবং সম্পর্কের বিষাক্ততার এক ঠান্ডা মাথার খেলা। ভালোবাসার আড়ালে কীভাবে দুটি মানুষ একে অপরকে ঘৃণা করেও সামাজিক ভাবমূর্তি ধরে রাখার লড়াই চালিয়ে যেতে পারে, সেটিই সিনেমাটির অন্যতম শক্তি।
২. গেট আউট: স্বাভাবিকতার আড়ালে ভয়ংকর ফাঁদ
বান্ধবী রোজের অভিজাত পরিবারের বাড়িতে বেড়াতে যায় কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ ক্রিস। শুরু থেকেই সেখানে কিছু অস্বাভাবিকতা তার চোখে পড়ে। মানুষের অদ্ভুত আচরণ, রহস্যময় হাসি কিংবা চায়ের কাপে চামচের টুংটাং শব্দ—সাধারণ মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে আতঙ্কের কারণ।
সম্মোহন, বর্ণবাদ এবং মানসিক নিয়ন্ত্রণের এক ভয়ংকর জগতে আটকে পড়ে ক্রিস। সামাজিক সৌজন্যের আড়ালে কী ভয়াবহ ফাঁদ লুকিয়ে থাকতে পারে, ‘গেট আউট’ সেটিই অসাধারণভাবে তুলে ধরে।
৩. দ্য গিফট: ভদ্রতার আড়ালে লুকানো প্রতিশোধ
নতুন জীবন শুরু করা সাইমন ও রবিন দম্পতির জীবনে হঠাৎ হাজির হয় সাইমনের হাইস্কুলের পুরোনো বন্ধু গর্ডো। তার অতিরিক্ত বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ শুরুতে অস্বস্তিকর হলেও তেমন ভয়ংকর মনে হয় না।
কিন্তু অতীতের ঘটনা ধীরে ধীরে সামনে আসতেই বদলে যায় সবকিছু। প্রকাশ পায় সাইমনের অন্ধকার এক অতীত এবং তার বিষাক্ত ব্যক্তিত্ব। গর্ডোর প্রতিশোধও প্রচলিত অর্থে কোনো সরাসরি শাস্তি নয়; বরং অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দেওয়ার এক ঠান্ডা পরিকল্পনা।
৪. এনিমি: একই মুখ, ভিন্ন পরিচয়
অন্তর্মুখী শিক্ষক অ্যাডাম একদিন সিনেমায় নিজের হুবহু এক প্রতিরূপকে দেখতে পান। তার নাম অ্যান্টনি। চেহারায় দুজনের কোনো পার্থক্য নেই, অথচ ব্যক্তিত্ব ও জীবনযাপনে তারা সম্পূর্ণ বিপরীত।
এই অদ্ভুত মিলের রহস্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে অ্যাডাম ধীরে ধীরে বাস্তবতা ও কল্পনার সীমারেখা হারাতে থাকেন। পরিচয়, অবচেতন মন এবং নিজের ভেতরের অস্বীকার করা সত্তাকে ঘিরে ‘এনিমি’ তৈরি করে এক অস্বস্তিকর ও দুঃস্বপ্নের মতো অভিজ্ঞতা।
৫. দ্য ইনভিজিবল ম্যান: অদৃশ্য আতঙ্কের পেছনে বিষাক্ত সম্পর্ক
অত্যাচারী সঙ্গীর কাছ থেকে পালিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে চায় সিসিলিয়া। কিন্তু তার মনে হয়, সেই অতীত যেন এখনও তাকে অনুসরণ করছে। খালি ঘর, নীরবতা কিংবা দরজার কোণ—সবকিছুতেই সে অনুভব করতে থাকে অদৃশ্য কারও উপস্থিতি।
পুরোনো ‘ইনভিজিবল ম্যান’ ধারণাকে আধুনিক নির্যাতন ও মানসিক আতঙ্কের গল্পে রূপ দিয়েছেন পরিচালক লি হোয়ানেল। অদৃশ্য শত্রুর ভয়কে এখানে কেবল সায়েন্স ফিকশনের বিষয় হিসেবে নয়, বরং বিষাক্ত সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক প্রভাব হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে।
৬. নকটার্নাল অ্যানিম্যালস: একটি পাণ্ডুলিপিতে লুকানো প্রতিশোধ
প্রাক্তন স্বামী এডওয়ার্ডের কাছ থেকে একটি পাণ্ডুলিপি পায় সুসান। বইটি পড়তে শুরু করতেই সে যেন ঢুকে পড়ে টেক্সাসের এক ভয়ংকর হাইওয়ে-গল্পের মধ্যে।
উপন্যাসের ঘটনা যত এগোয়, সুসানের নিজের অতীতও তত বেশি সামনে আসতে থাকে। তার বিলাসবহুল কিন্তু একঘেয়ে জীবনের পাশে পাণ্ডুলিপিটি হয়ে ওঠে অনুযোগ, অপরাধবোধ ও প্রতিশোধের এক নীরব দলিল। সরাসরি উপস্থিত না থেকেও কীভাবে একজন মানুষ অন্যজনকে মানসিকভাবে আঘাত করতে পারে, সিনেমাটি তারই এক শীতল উদাহরণ।
৭. শাটার আইল্যান্ড: সত্য, অপরাধবোধ ও আত্মপ্রবঞ্চনা
মানসিক রোগীদের একটি দ্বীপের হাসপাতালে নিখোঁজ এক রোগীর সন্ধানে যান তদন্তকারী টেডি ড্যানিয়েলস। তদন্ত যত এগোয়, ততই অদ্ভুত হয়ে ওঠে ঘটনাগুলো। শেষ পর্যন্ত দর্শক বুঝতে পারেন, পুরো তদন্তের পেছনে লুকিয়ে আছে টেডির নিজের অতীত, অপরাধবোধ এবং বাস্তবতা থেকে পালানোর চেষ্টা।
সত্যকে মেনে নেওয়া কখনও কখনও মানুষের জন্য কতটা কঠিন হতে পারে, ‘শাটার আইল্যান্ড’ সেই প্রশ্নই সামনে আনে। শেষ দৃশ্যের পরও ছবিটির রহস্য ও মানসিক দ্বন্দ্ব দর্শককে ভাবিয়ে রাখে।
৮. দ্য হ্যান্ডমেইডেন: প্রতারণার ভেতর স্বাধীনতার গল্প
ধনী লেডি হিদেকোকে প্রতারণা করে তার সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনায় তার পরিচারিকা হিসেবে আসে সুক-হি। কিন্তু গল্প যত এগোয়, ততই বদলে যায় চরিত্রগুলোর অবস্থান। কে কাকে ব্যবহার করছে, আর কে আসলে কার সঙ্গে প্রতারণা করছে—তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
একাধিক স্তরের ছলনা ও অভিনয়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া এই সিনেমায় শেষ পর্যন্ত নারীরাই নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের পথ খুঁজে নেয়। প্রতারণা, আকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতা ও স্বাধীনতার জটিল সম্পর্ককে অসাধারণ ভঙ্গিতে তুলে ধরেছে ‘দ্য হ্যান্ডমেইডেন’।
৯. প্রিজনার্স: সন্তানের জন্য একজন বাবার সীমা কতদূর?
মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর কেলার ডোভার মরিয়া হয়ে ওঠেন। পুলিশের তদন্তে আস্থা হারিয়ে তিনি নিজেই এক সন্দেহভাজন যুবককে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতন শুরু করেন।
সন্তানকে বাঁচানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা কীভাবে একজন মানুষকে নৈতিক সীমা অতিক্রম করিয়ে দিতে পারে, সেটিই সিনেমাটির অন্যতম প্রধান প্রশ্ন। অন্যদিকে তদন্ত কর্মকর্তা সত্যের সন্ধানে নিজের মতো করে এগিয়ে যান। ভালোবাসা, ভয়, প্রতিশোধ ও নৈতিকতার সংঘাত ‘প্রিজনার্স’-কে করে তুলেছে তীব্র এক মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার।
১০. ব্ল্যাক সোয়ান: নিখুঁত হওয়ার নেশায় আত্মধ্বংস
নৃত্যশিল্পী নিনা চায় ‘সোয়ান কুইন’ চরিত্রে নিখুঁতভাবে অভিনয় করতে। কিন্তু সেই নিখুঁত হওয়ার চাপই ধীরে ধীরে তার মানসিক জগতকে অস্থির করে তোলে। মায়ের কঠোর নিয়ন্ত্রণ, প্রতিদ্বন্দ্বীর উপস্থিতি এবং নিজের প্রতি অতিরিক্ত প্রত্যাশা তাকে বাস্তবতা ও কল্পনার মাঝামাঝি এক অন্ধকার জগতে নিয়ে যায়।
নিখুঁত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা কখন নিজের বিরুদ্ধেই দাঁড়ায়—‘ব্ল্যাক সোয়ান’ সেই প্রশ্নের ভয়ংকর উত্তর খোঁজে। শিল্পীসত্তা, প্রতিযোগিতা, আত্মপরিচয় ও মানসিক ভাঙনের এক অসাধারণ চিত্রায়ন এই সিনেমা।
বাপ্পি/সা.এ


