দীর্ঘ এক যুগ পর কিশোরগঞ্জে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতিকে ঘিরে নতুন করে উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে জেলাজুড়ে। ২০১৪ সালের ১২ নভেম্বর সর্বশেষ কিশোরগঞ্জে পা রেখেছিলেন প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এরপর কেটে গেছে এক যুগ। এবার তাঁর উত্তরসূরি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমনকে ঘিরে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে পুরো জনপদে। নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি হয়েছে নানা প্রত্যাশা এই সফর কি কিশোরগঞ্জের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-ঘাটতি পূরণের নতুন দুয়ার খুলবে?
২০১৪ সালের ১২ নভেম্বর জেলা বিএনপির আয়োজনে কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল সরকারি কলেজ মাঠে ২০ দলীয় জোটের সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। এর আগে ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকারের শেষ সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কিশোরগঞ্জ সফর করেছিলেন তিনি। সেই হিসেবে তাঁর সর্বশেষ সফরের এক যুগ পর আবারও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের পদচারণায় মুখর হতে যাচ্ছে কিশোরগঞ্জ।
তারেক রহমানের সফরকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। সড়ক, সরকারি স্থাপনা ও অনুষ্ঠানস্থল সাজানো হয়েছে নতুন রূপে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে নির্মাণ করা হয়েছে তোরণ। দলীয় নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে টানানো হয়েছে ব্যানার-পোস্টার। সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
রোববার সকাল থেকেই প্রধানমন্ত্রীর পদচারণায় সরব হয়ে ওঠার অপেক্ষায় পুরো জেলা। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। দীর্ঘদিন পর প্রধানমন্ত্রীর সফরকে শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন না স্থানীয়রা; বরং এটিকে কিশোরগঞ্জের উন্নয়ন সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নতুন আশার উপলক্ষ হিসেবেও দেখছেন অনেকে।
সফরসূচি অনুযায়ী, রোববার সকাল ৯টায় নিজ বাসভবন থেকে সড়কপথে কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে পাকুন্দিয়া উপজেলার মির্জাপুর চেয়ারম্যানবাড়ি ঘাট এলাকায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে মাছের পোনা অবমুক্ত করবেন তিনি। সেখানে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
এরপর দুপুর ১২টায় কটিয়াদী উপজেলার উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন তিনি। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আচমিতা ইউনিয়নের চারিপাড়া কার্প হ্যাচারি পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে একই এলাকার আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউশন মাঠে আয়োজিত জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। অনুষ্ঠানে মৎস্য খাতে অবদানের জন্য সেরাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
কটিয়াদী থেকে কিশোরগঞ্জ শহরের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন প্রধানমন্ত্রী। দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে সেখানে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন তিনি। একইসঙ্গে জেলা ছাত্রদলের আয়োজিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
কটিয়াদী থেকে কিশোরগঞ্জ শহরের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন প্রধানমন্ত্রী। দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে সেখানে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন তিনি। একইসঙ্গে জেলা ছাত্রদলের আয়োজিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
এরপর বিকেল ৩টার দিকে জেলা সার্কিট হাউজে গিয়ে কিছু সময় বিরতি নেবেন প্রধানমন্ত্রী। সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলোর একটি অনুষ্ঠিত হবে বিকেল ৪টায় কিশোরগঞ্জ পুরাতন স্টেডিয়ামে। সেখানে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, বিভিন্ন অনুদান প্রদান এবং মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের সম্মানী প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন তিনি।
সফরের শেষ পর্যায়ে সন্ধ্যা ৬টার দিকে কিশোরগঞ্জ ত্যাগ করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
তারেক রহমানের এই সফরকে ঘিরে কিশোরগঞ্জবাসীর প্রত্যাশার জায়গাটিও বেশ বিস্তৃত। বিশেষ করে শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে দীর্ঘদিনের নানা সীমাবদ্ধতা দূর করার দাবি রয়েছে স্থানীয়দের। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যাশা রয়েছে সাধারণ মানুষের।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর কিশোরগঞ্জের উন্নয়ন পরিকল্পনায় নতুন গতি আনবে। শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়নের বাইরে দেশের অন্যান্য জেলার মতো কিশোরগঞ্জকেও একটি আধুনিক, পরিকল্পিত ও অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় জনপদ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে—এমন আশাও করছেন তারা।
এক যুগ আগে বেগম খালেদা জিয়ার সফরের স্মৃতি এখনও কিশোরগঞ্জবাসীর মনে রয়েছে। সেই স্মৃতির ধারাবাহিকতায় এবার তারেক রহমানের আগমনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন আবহ। রাজনৈতিক উত্তাপের পাশাপাশি উন্নয়ন ও পরিবর্তনের প্রত্যাশাই যেন এই সফরের মূল আলোচনায় পরিণত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফর শেষ পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের মানুষের কতটা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে তাঁর আগমনের আগেই যে প্রত্যাশার ঢেউ উঠেছে, তাতে স্পষ্ট কিশোরগঞ্জবাসী শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার আগমন নয়, নিজেদের জনপদের উন্নয়ন ও ভাগ্য পরিবর্তনেরও নতুন সম্ভাবনা দেখতে চাইছেন।


