Homeসর্বশেষচাঁদাবাজির টাকা রিটার্নে দেখাবেন কীভাবে- আইন কী বলে, ইসলাম কী বলে?

চাঁদাবাজির টাকা রিটার্নে দেখাবেন কীভাবে- আইন কী বলে, ইসলাম কী বলে?

Published on

spot_img

চাঁদাবাজি করে লাখ কিংবা কোটি টাকা আদায় করলেন কেউ। সেই অর্থ দিয়ে বাড়ি, গাড়ি, জমি বা ব্যবসা গড়ে তুললেন। প্রশ্ন উঠতে পারে—এই অর্থ যেহেতু বৈধ উপায়ে অর্জিত নয়, তাই কি এর ওপর আয়করও দিতে হবে না? আবার আয়কর দিলেই কি অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ ‘বৈধ’ হয়ে যায়? ইসলামের দৃষ্টিতেই বা চাঁদাবাজির অর্থের বিধান কী?

প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে অদ্ভুত মনে হলেও এর মধ্যে আইন, করনীতি এবং ধর্মীয় নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় জড়িয়ে রয়েছে।

অবৈধ অর্থ আর কর—দুটি আলাদা বিষয়
বাংলাদেশে বর্তমানে আয়করের মূল আইন হচ্ছে আয়কর আইন, ২০২৩, যা পরবর্তী সময়ে সংশোধিতও হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওয়েবসাইটে মূল আইন ও সংশোধনীগুলো প্রকাশিত রয়েছে। আইনের ২৬ ধারায় মোট আয়ের পরিধি নির্ধারণ করতে গিয়ে ‘all income, from whatever source derived’ বা যে উৎস থেকেই আয় আসুক—এমন বিস্তৃত ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।

তবে এখান থেকে সরাসরি এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না যে, ‘চাঁদাবাজির টাকা অবশ্যই সাধারণ বৈধ আয়ের মতো কর দিয়ে বৈধ করা যায়।’ নির্দিষ্ট অপরাধলব্ধ অর্থের ক্ষেত্রে আয়কর আইনের পাশাপাশি ফৌজদারি আইন, মানিলন্ডারিং-সংক্রান্ত বিধান এবং সম্পদ জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করার বিধানও প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কর দেওয়া কোনো অর্থের উৎসকে বৈধ করে না।

অর্থাৎ কেউ অবৈধভাবে অর্থ অর্জন করে পরে সেই অর্থ বা সম্পদ আয়কর রিটার্নে দেখালেন কিংবা কোনো কর পরিশোধ করলেন—শুধু এ কারণে অর্থের অপরাধমূলক উৎস মুছে যায় না। কর পরিশোধ এবং অর্থ অর্জনের বৈধতা দুটি স্বতন্ত্র আইনি প্রশ্ন।

সহজ উদাহরণ দেওয়া যায়—কেউ যদি চাঁদাবাজি করে ৫০ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন, সেই টাকার ওপর কোনো কর-দায় সৃষ্টি হলেও কর পরিশোধের মাধ্যমে চাঁদাবাজির অপরাধ থেকে দায়মুক্তি পাওয়া যায় না।

বরং অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তাকে ব্যাখ্যা করতে হতে পারে অর্থটি কোথা থেকে এসেছে।

তাহলে চাঁদাবাজির টাকা রিটার্নে দেখালে কী হবে?
এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। আয়কর রিটার্নে কোনো অর্থ বা সম্পদ উল্লেখ করা আর সেই সম্পদের বৈধ উৎস প্রমাণ করা এক বিষয় নয়।
কেউ অবৈধ অর্থ দিয়ে সম্পদ কিনে পরে সম্পদটি রিটার্নে দেখালেই মূল অর্থ বৈধ হয়ে যায়—এমন সাধারণ সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই।

ফলে ‘কর দিয়েছি, তাই টাকা বৈধ’—এই ধারণা আইনগতভাবে বিভ্রান্তিকর।
বাংলাদেশের বিদ্যমান আয়কর আইন ও সংশোধনী সম্পর্কে এনবিআরের প্রকাশিত আইনই প্রাথমিক সরকারি উৎস।

ইসলাম কী বলে?
ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট।
চাঁদাবাজির মাধ্যমে অন্যের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ নেওয়া বৈধ উপার্জন নয়। কোরআনে অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভোগ করতে নিষেধ করা হয়েছে।
সুরা আল-বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস না করতে এবং জেনেশুনে অন্যের সম্পদের অংশ অন্যায়ভাবে ভোগ না করতে।
এই মূলনীতির আলোকে ভয় দেখিয়ে, ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে কিংবা ক্ষতির হুমকি দিয়ে কারও কাছ থেকে অর্থ আদায় করা ইসলামে বৈধ উপার্জন হিসেবে গণ্য হওয়ার সুযোগ নেই।

অর্থাৎ চাঁদাবাজির অর্থের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি শুধু ‘এই টাকার ওপর আয়কর দিতে হবে কি না’—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রথম প্রশ্ন হবে—এই অর্থ নেওয়ার অধিকারই কি ওই ব্যক্তির ছিল?

উত্তর যদি না হয়, তাহলে অর্থটি নিজের সম্পদ হিসেবে ভোগ করার অধিকারও তার নেই।
কর দিলেই কি হারাম টাকা হালাল হবে? না।

রাষ্ট্রকে কর দেওয়া একটি নাগরিক ও আইনগত বিষয়। আর সম্পদটি শরিয়তসম্মতভাবে অর্জিত হয়েছে কি না, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন।
ফলে চাঁদাবাজির মাধ্যমে অর্জিত ১০ লাখ টাকা থেকে কেউ নির্ধারিত পরিমাণ কর দিলেও বাকি অর্থ শুধু কর দেওয়ার কারণে হালাল হয়ে যাবে না।
একইভাবে অবৈধ অর্থ দিয়ে জমি বা গাড়ি কিনে সেটি আয়কর রিটার্নে দেখালেও ইসলামের দৃষ্টিতে অর্থের মূল উৎসের সমস্যার সমাধান হয় না।

চাঁদাবাজির টাকা থাকলে ইসলামে করণীয় কী?
এখানে চাঁদাবাজির মতো অর্থ এবং অন্য ধরনের হারাম উপার্জনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
যে অর্থ নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে অন্যায়ভাবে নেওয়া হয়েছে, ইসলামি ফিকহের সাধারণ নীতি অনুযায়ী তা সম্ভব হলে সেই ব্যক্তিকেই ফেরত দিতে হবে। তিনি মারা গেলে তার উত্তরাধিকারীদের কাছে ফেরত দেওয়ার প্রশ্ন আসে। মালিককে খুঁজে পাওয়া বা অর্থ ফেরত দেওয়া বাস্তবিকভাবে অসম্ভব হলে কীভাবে অর্থ থেকে দায়মুক্ত হওয়া যাবে, সে বিষয়ে আলেমদের ফিকহি নির্দেশনা রয়েছে।

তাই চাঁদাবাজির টাকা নিজের কাছে রেখে শুধু কিছু অংশ দান করে দিলেই দায়িত্ব শেষ—এমন ধারণাও সঠিক নয়।
ধরা যাক, কোনো ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ভয় দেখিয়ে এক লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। পরে চাঁদাবাজ ব্যক্তি অনুতপ্ত হলেন। সেই ব্যবসায়ীকে চিহ্নিত করা সম্ভব হলে প্রথম দায়িত্ব হবে তার অর্থ তাকে ফেরত দেওয়া।

কারণ এটি শুধু ‘হারাম আয়’ নয়; এর সঙ্গে অন্য একজন মানুষের হক যুক্ত রয়েছে।

দান করে দিলেই কি পাপ শেষ? সব ক্ষেত্রে নয়।

বিশেষ করে যার কাছ থেকে অন্যায়ভাবে অর্থ নেওয়া হয়েছে তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হলে তার সম্পদ তাকে ফেরত দেওয়াই মূল বিষয়। নির্দিষ্ট মালিকের অর্থ নিজের ইচ্ছামতো অন্যত্র দান করে দেওয়ার মাধ্যমে মালিকের দাবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না।

তবে প্রকৃত মালিককে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হলে অর্থ কীভাবে নিষ্পত্তি করা হবে—এ বিষয়ে আলেমদের ব্যাখ্যায় জনকল্যাণ বা মালিকের পক্ষ থেকে দান করার কথা পাওয়া যায়।

এ ধরনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতি অনুযায়ী যোগ্য মুফতি বা ইসলামি আইনজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া অধিক নিরাপদ।

তওবার ক্ষেত্রেও মানুষের হক গুরুত্বপূর্ণ

ইসলামে তওবা মানে শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়া নয়। অন্যের অধিকার নষ্ট করা হলে সেই অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে তাই প্রথমত অন্যায় কাজটি বন্ধ করা, দ্বিতীয়ত আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া এবং তৃতীয়ত যাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে নেওয়া হয়েছে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা জরুরি।

এখানেই চাঁদাবাজির অর্থের বিষয়টি সুদ, নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রি বা অন্য কোনো হারাম আয়ের কিছু ধরনের তুলনায় আলাদা হতে পারে। কারণ চাঁদাবাজির অর্থের পেছনে সাধারণত একজন নির্দিষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা থাকে।

আইন ও ইসলামের জায়গা কোথায় মিলছে?
দুই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ও কাঠামো আলাদা হলেও একটি জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ মিল দেখা যায়—কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করলেই অপরাধমূলক উৎসের অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ হয়ে যায় না।

রাষ্ট্রীয় আইনে কর দেওয়া অপরাধের দায় মুছে দেওয়ার পদ্ধতি নয়। অন্যদিকে ইসলামে হারাম পথে অন্যের সম্পদ নেওয়ার পর সেই অর্থের একটি অংশ রাষ্ট্রকে কর হিসেবে দিয়ে দিলেই অবশিষ্ট অর্থ হালাল হয়ে যায় না।

ফলে ‘চাঁদাবাজির টাকা থেকে সরকারকে আয়কর দিয়ে দিলাম, এখন বাকি টাকা বৈধ’—এমন যুক্তি আইন কিংবা ইসলামের নৈতিক কাঠামো—কোনোটির সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

শেষ কথা
চাঁদাবাজির অর্থের ক্ষেত্রে তাই তিনটি প্রশ্ন আলাদা করে দেখতে হবে—অর্থটি কীভাবে অর্জিত হয়েছে, রাষ্ট্রীয় আইনে এর কী পরিণতি হতে পারে এবং ইসলামের দৃষ্টিতে অর্থটির প্রকৃত মালিক কে।

আয়কর দেওয়া রাষ্ট্রের কাছে একটি আর্থিক দায় হতে পারে; কিন্তু কর পরিশোধ অপরাধের বৈধতার সনদ নয়। একইভাবে ইসলামের দৃষ্টিতে চাঁদাবাজির মাধ্যমে নেওয়া অর্থের ওপর কর দিলেই সেই অর্থ হালাল হয়ে যায় না।

বরং যার কাছ থেকে অন্যায়ভাবে অর্থ নেওয়া হয়েছে, তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অতএব, চাঁদাবাজির টাকার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ‘কত টাকা কর দিতে হবে’ নয়; প্রশ্ন হলো—যে টাকা নিজেরই নয়, সেই টাকার ওপর মালিকানা দাবি করার অধিকার কোথায়?



সাজু/নিএ

Latest articles

এমপি ফখর উদ্দিনের বিরুদ্ধে ভূক্তভোগী পরিবারের সংবাদ সম্মেলন

স্থানীয় পর্যায়ে লোকজন বিপদে আপদে নিজ আসনের এমপির দারস্থ হলেও আমাদের এমপি আমাদের...

বিশ্বরেকর্ড ভেঙে দিলেন ঋষভ পান্ত

টেস্ট ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস গড়লেন ঋষভ পান্ত। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গলে সিরিজের প্রথম টেস্টের...

সরিষাবাড়ীতে সড়ক দুর্ঘটনায় কৃষকের মৃত্যু

জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে রাস্তা পার হওয়ার সময় অটোরিকশার ধাক্কায় কৃষক জাবেদ আলী (৬২) নামের...

শাপলাই এখন বরিশালের শত শত পরিবারের জীবিকার অবলম্বন

বর্ষার জলে বিল-ঝিল, খাল কিংবা ডুবে থাকা কৃষি জমিতে ফুটে থাকা শাপলাই এখন...

More like this

এমপি ফখর উদ্দিনের বিরুদ্ধে ভূক্তভোগী পরিবারের সংবাদ সম্মেলন

স্থানীয় পর্যায়ে লোকজন বিপদে আপদে নিজ আসনের এমপির দারস্থ হলেও আমাদের এমপি আমাদের...

বিশ্বরেকর্ড ভেঙে দিলেন ঋষভ পান্ত

টেস্ট ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস গড়লেন ঋষভ পান্ত। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গলে সিরিজের প্রথম টেস্টের...

সরিষাবাড়ীতে সড়ক দুর্ঘটনায় কৃষকের মৃত্যু

জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে রাস্তা পার হওয়ার সময় অটোরিকশার ধাক্কায় কৃষক জাবেদ আলী (৬২) নামের...